আজকের আলোচনার বিষয় বর্তমান কালের লিঙ্গীয় বৈষম্য – যা লিঙ্গের ভিত্তিতে বিভাজন এর অর্ন্তভুক্ত, বর্তমান কালে নারী-পুরুষের বৈষম্যের কতগুলি স্পষ্ট দিক খেয়াল করা যায়। আগেই আলোচনা করেছি যে, অ-ইউরোপীয় সমাজে বৈষম্যের উপাদান কম ছিল। পক্ষান্তরে, বর্তমান সমাজে নানাবিধ সম্পদ ও সুবিধা থাকাতে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদের উপকরণ হিসেবে সেগুলি কাজ করে।
বর্তমান কালে গেরস্তালির কাজের বাইরে সকল কাজই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে করে থাকেন। শিল্প উৎপাদনের জন্য নারী শ্রমিক এখন নিয়মিত ব্যাপার। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প এর ভাল উদাহরণ হতে পারে। এছাড়া নির্মাণ শিল্পে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ আছে। কিন্তু নারীর প্রতি বৈষম্য আর নিপীড়নও সমান তালে চলছে। প্রথমেই মজুরির কথা বলা যায়।
বর্তমান কালের লিঙ্গীয় বৈষম্য

গার্মেন্টস কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে দেখা নারী শ্রমিকের মজুরি পুরুষ অপেক্ষা কম। অনেক গবেষণায় দেখা যায় নারীকে কম মজুরি দেবার ইচ্ছে থেকেই অনেক শিল্পে নারীকে বেশি করে নিয়োগ দেয়া হয়। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয় নারীকে। এমনিতেই শ্রমিক শ্রেণীর কাজের পরিবেশ নিশ্চিত নেই। ফলে নানা ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হয় শ্রমিকেরা। কিন্তু নারীর জন্য বাড়তি নিপীড়ন হচ্ছে যৌন হয়রানি। এর মধ্যে থেকেই কাজ করতে হয় নারী শ্রমিককে। কিন্তু রোজগার করার কারণে নারী তাঁর ঘর-গেরস্তালির কাজ হতে মুক্তি পান না। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের কাজ করে তাঁকেই আবার রান্না-বান্না, বাচ্চা দেখা শোনা কিংবা অন্যদের সেবা যত্ন করতে হয়।
নারীরা
পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেক,
সমগ্র কর্মঘন্টার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময়
তাঁদের কাজ করতে হয়,
তাঁরা রোজগার করেন পৃথিবীর মোট আয়ের
এক-দশমাংশ,
এবং পৃথিবীর ধন-সম্পদের
এক-শতাংশের ও কম আছে তাঁদের আয়ত্তে ।
সূত্র : ইউনাইটেড নেশনস রিপোর্ট, ১৯৮০
শিক্ষিত এবং স্বচ্ছল শ্রেণীর নারীদের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। সকল ধরনের পেশাতেই নারীরা কাজ করছেন। চাকুরিতে নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো থাকাতে মজুরির নিপীড়ন এক্ষেত্রে ঘটে না। এখানে প্রাথমিক বৈষম্য কিছুটা ঘোরানো পথে হয়ে থাকে। অনেক চাকুরিতেই নিয়োগ দেবার ক্ষেত্রে পুরুষকে প্রাধান্য দেয়া হয়। যদিও হয়তো নিয়োগ বিধিতে উভয় লিঙ্গকে সমান প্রাধান্য দেবার কথা বলা আছে। শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে গর্ভকালীন ছুটির কোন নিশ্চয়তা না থাকলেও উঁচু চাকুরিতে আছে। তবে গর্ভকালীন ছুটি নিতান্ত কম ।
নারী চাকুরি করুন বা নাই করুন স্বচ্ছল নারীদেরকেও ঘর-গেরস্তালির কাজ, বাচ্চাদের দেখাশোনা বা লেখাপড়া করানো, অন্যদের – বিশেষভাবে স্বামীকে দেখাশোনা করার কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে না – করতে চাইলে সেটা খুব নিন্দনীয় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সেই নারী ‘মন্দ’ বলে সাব্যস্ত হন । নানা রকম হয়রানির আতঙ্ক এই শ্রেণীর নারীদের কর্মক্ষেত্রেও রয়েছে। পত্র-পত্রিকায় সে ব্যাপারে প্রচুর প্রতিবেদনও প্রকাশ পায় ।
বর্তমান সমাজে স্বচ্ছল বা শ্রমিক উভয় শ্রেণীতেই বিয়ের মধ্যেও নারী-পুরুষের ভেদাভেদ বা বৈষম্য বোঝা যায়। উভয় শ্রেণীতেই যৌতুক দিয়ে নারীদের বিয়ে হয়। তবে সাধারণভাবে মনে করা হয় যৌতুক কেবল দরিদ্র মানুষের মধ্যেই প্রচলিত। আসলে স্বচ্ছল মানুষজন যৌতুককে উপহার বলে চালিয়ে থাকেন। যৌতুকের কারণে শারীরিক নির্যাতন উভয় ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। নারী-পুরুষ অসমতার একটা প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে ঘরের কাজ। এতে পুরুষের প্রায় কোন ধরনের অংশগ্রহণ থাকে না। বলা হয়ে থাকে পুরুষ রোজগার করে আর নারী সংসার চালায়। কিন্তু শহুরে স্বচ্ছল শ্রেণীতে এখন এই কথাটা খুব একটা খাটে না। নারীরাও সেখানে রোজগার করেন।

তাছাড়া ঘরের কাজের যদি মজুরি হিসাব করা হয় তাহলে পুরো চিত্রটা একেবারেই বদলে যাবে। এখানে একটা প্রসঙ্গ লক্ষ্য করবার আছে। ঘরের কাজে যাবতীয় প্রকারে নারী শ্রম দিয়ে যাবেন। কিন্তু এই শ্রমকে অনুৎপাদনশীল মনে করা হয়। গৃহকাজে নারীর শ্রমের কোন মজুরী হিসেব করা হয় না এবং একে হালকা করে দেখা হয়। এভাবে নানান বস্তুগত উপায়ে নারীর উপর নিপীড়ন আছে। সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইনেও নারীর প্রতি বৈষম্য করা হয়ে থাকে। কোন কারণে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে বাচ্চাদের ওয়ারিশ নিয়ে প্রচলিত আইন এবং সামাজিক অনুশীলন নারীর বিপক্ষে যায়।
বস্তুগত নানাবিধ নিপীড়নের পাশাপাশি আরেকটা বৈষম্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে: নারীকে নিরন্তর অবমূল্যায়ন করা হয়। নারীর কাজ, চিন্তা, জীবন সব কিছুকে উপেক্ষা করা হয়। এই অবমূল্যায়ন বা অমর্যাদাকে বিশে- ষণ করলে দেখা যায় এটা দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন। সত্যিকার অর্থে এই উপেক্ষা করে থাকেন পুরুষেরা। তবে সমাজে একটা দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠলে তাতে নারীরাও সামিল হয়ে যেতে পারেন।
তাই অনেক সময় দেখা যায় নারীর বিরুদ্ধে নারীও পদক্ষেপ নিয়ে বসতে পারেন। এ কারণে দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরুষের না বলে পুরুষবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বলা হয়ে থাকে। সংক্ষেপে পুরুষবাদী দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে: যে চিন্তা দ্বারা নারীকে অক্ষম মনে করা হয়, নারীর প্রতি আক্রমণাত্মক পরিবেশ তৈরি করা হয় এবং নারীকে যাবতীয় সুবিধার বাইরে রাখার ব্যাখ্যা তৈরি করা হয়। গত তিন দশকে এই সব ভাবনা-চিন্তা নিয়ে শক্তিশালী নারী আন্দোলন গড়ে উঠেছে সারা পৃথিবীতে। এই আন্দোলন একদিকে সমাজে নারী-পুরুষের যে বস্তুগত অসমতা আছে (অল্প মজুরি, সম্পত্তি ভাগ, উত্তরাধিকার আইন, যৌন হয়রানি, যৌতুক ইত্যাদি) তার বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির (উপেক্ষা, গেরস্থালির কাজে পুরুষের অংশ না নেয়া, আক্রমণাত্মক পরিবেশ গড়ে তোলা) বিরুদ্ধে। নারী আন্দোলনের কর্মীরা এবং চিন্তুকগণ নারীর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পরিবেশ নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়েছেন এবং আমাদের দৃষ্টিগোচর করিয়েছেন। এ কথা ঠিক যে ধর্ষণ বা এসিড নিক্ষেপ আক্রমণাত্মক পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়ানক উদাহরণ। কিন্তু নারীর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মনোভাব আরও সূক্ষ্ম চোখে দেখার প্রয়োজন আছে। প্রচার মাধ্যমে নারীকে যেভাবে উপস্থাপনা করা হয় সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে।

এমনকি ঈদের পত্রিকাতে যে সব কার্টুন আঁকা হয় সেখানেও নারীকে লোভী, গয়না পিপাসু হিসেবে দেখানো হয়ে থাকে। এতে আড়াল হয়ে যায় কিভাবে নারী সংসার চালাবার যাবতীয় দায়িত্ব নিয়ে আসছেন। অন্য লিঙ্গের প্রতি পুরুষবাদী সমাজের মনোভাবের আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে হিজড়া সমাজ। তাঁদের জীবনের অবহেলা, আয়ের কোন পথ না থাকা এবং সর্বোপরি মর্যাদা না থাকা দেখে আমরা বুঝতে পারি আমাদের বর্তমান সমাজ কতটা একলিঙ্গবাদী – আর সেই লিঙ্গ হচ্ছে পুরুষ। ফলে পুরুষবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বদল না ঘটলে নারী-পুরুষের সমতার পুরো লক্ষ্য অর্জিত হবে না। পুরো লক্ষ্য অর্জন হওয়া কেবল আইন বা আয় উপার্জন দিয়ে হবার নয় – সে কথাই নারী আন্দোলনের কর্মী এবং চিন্তকেরা বলছেন।
আরও দেখুনঃ
