আজকের আলোচনার বিষয় বিদ্রোহ ও সংগ্রামের ইতিহাস – যা সাঁওতাল জনগোষ্ঠী এর অর্ন্তভুক্ত, নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও আপেক্ষিক স্বাধীনতা বজায় রেখে সাঁওতালদের মত আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা | অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকাসমূহে বসতি স্থাপন করে আসলেও বিভিন্ন সময়ে অধিকতর শক্তিশালী | জনগোষ্ঠীদের আগ্রাসনের মোকাবেলা তাদের করতে হয়েছে।
এই আগ্রাসন নূতন মাত্রা ও তীব্রতা লাভ করে উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। ঔপনিবেশিক শাসন-ব্যবস্থার | আওতায় যখন সাঁওতাল তথা অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা ব্যাপক হারে শোষণ-নিপীড়নের মুখে | পতিত হয়, তাদের অনেকে চেষ্টা করেছিল রুখে দাঁড়াতে।
বিদ্রোহ ও সংগ্রামের ইতিহাস
এভাবে সংঘটিত হয়েছিল ১৮৫৫-৫৬ সালের ইতিহাস-খ্যাত ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’, যেখানে সিদু ও কানু, নামের দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে হাজার হাজার সাঁওতাল ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে নেমে পড়েছিল। বিহারের ভাগলপুর থেকে বীরভূম পর্যন্ত বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক গোষ্ঠী ও তাদের সহায়ক দেশীয় জমিদার-মহাজনদের শোষণ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে।
শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল, কিন্তু সাঁওতালদের প্রতিরোধকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া যায় নি। বাঙালী ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর যেসব সদস্যরা জমিদার-মহাজন বেশে সাঁওতাল-ভূমিতে আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, তাদেরকে সাঁওতালরা অভিহিত করত ‘ডিকু’ হিসাবে। এই ‘ডিকু’দের প্রতি সাঁওতালরা যে ঘৃণা ও অবিশ্বাস ঐতিহাসিকভাবে লালন করেছে, সেটাকে দেখা যেতে পারে ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের প্রতি তাদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসাবে।
বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ তথা অন্যান্য অঞ্চলে যেসব সাঁওতালরা এখন রয়েছে, তারা মূলতঃ এসব এলাকায় অভিবাসিত হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। ঐতিহ্যগতভাবে শিকার ও কৃষি-নির্ভর সাঁওতালরা এদেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রথম জনবসতি গড়ে তুলেছিল। তবে এসব জায়গায়ও তারা সংখ্যাগুরুদের আগ্রাসন ও ক্ষমতাসীনদের শোষণ-নিপীড়ন থেকে রেহাই পায়নি।
১৯৪০-এর দশকে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে রাজশাহীর নাচোলে সংঘটিত ‘তেভাগা আন্দোলনে’ সাঁওতাল বর্গাচাষীরাই নেতৃত্ব দিয়েছিল। এই আন্দোলন ‘নাচোল বিপ্লব’ বা ‘রাজশাহীর / নাচোলের সাঁওতাল বিদ্রোহ’ নামেও পরিচিত। এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল জমির ফসলের ভাগাভাগিতে বর্গা-চাষীদের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা। তবে রাষ্ট্রব্যবস্থা এগিয়ে এসেছিল জোতদারদের পক্ষে।
ফলে সাঁওতাল বিদ্রোহীরা ব্যাপক নিপীড়নের শিকার হয়। বাঙালী হিন্দু ও মুসলমান কৃষকরাও এই আন্দোলনে সমর্থন-সহায়তা জোগালেও দমনমূলক ব্যবস্থা মূলতঃ সাঁওতালদের বিরুদ্ধেই গৃহীত হয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ ধরনের বৈষম্য, অন্যায় ও নিপীড়ন-নির্যাতন থেকে এদেশের সাঁওতালরা এখনো মুক্ত হয় নি।
আরও দেখুনঃ

