Site icon Anthropology Gurukul [ নৃবিজ্ঞান গুরুকুল ] GOLN

মাতৃসূত্রীয় জ্ঞাতি ব্যবস্থা

মাতৃসূত্রীয় জ্ঞাতি ব্যবস্থা

মাতৃসূত্রীয় জ্ঞাতি ব্যবস্থা

আজকের আলোচনার বিষয় মাতৃসূত্রীয় জ্ঞাতি ব্যবস্থা – যা গারো জনগোষ্ঠী এর অর্ন্তভুক্ত, গারোদের একটি সামাজিক বৈশিষ্ট্য তাদেরকে অনন্যতা দিয়েছে, সেটা হল তাদের ‘মাতৃসূত্রীয়’ জ্ঞাতি ব্যবস্থা (matrilineal kinship system ) । বাংলাদেশে গারোরা ছাড়া একমাত্র খাসিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনুরূপ ব্যবস্থা বিদ্যমান। গারোদের ‘মাতৃসূত্রীয়’ জ্ঞাতি ব্যবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়ার আগে এখানে প্রাসঙ্গিক একটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার।

মাতৃসূত্রীয় জ্ঞাতি ব্যবস্থা

 

 

বইপত্রে গারো সমাজকে ‘মাতৃতান্ত্রিক” হিসাবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। তবে মাতৃতন্ত্রের (matriarchy) ধারণা ব্যবহারে কিছুটা বিভ্রান্তির অবকাশ থেকে যায়, বিশেষ করে এটিকে পিতৃতন্ত্রের (patriarchy) বিপরীত হিসাবে গণ্য করা হলে। পিতৃতন্ত্র বলতে শুধু এটাই বোঝায় না যে সন্তানদের বংশ পরিচয় পিতার সূত্রে নির্ধারিত হয়, বরং পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পারিবারিক পরিসরে পিতার থাকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব এবং সমাজে সাধারণভাবে নারীদের উপর পুরুষদের কর্তৃত্ব স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত।

ঠিক এর বিপরীত অবস্থা কোন সমাজে পরিলক্ষিত হয় নি যেখানে সমাজের সর্বস্তরে পুরুষদের উপর নারীরা কর্তৃত্ব করে। বরং ‘যোদ্ধা”, “গ্রাম-প্রধান’ প্রভৃতি ভূমিকায় পুরুষদেরই সচরাচর দেখা যায়। কাজেই এই সমস্ত বিষয় বিবেচনায় নিলে গারো বা অন্য কোন বিদ্যমান সমাজকে ‘মাতৃতান্ত্রিক’ হিসাবে অভিহিত করা যথার্থ নয়।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

মাতৃসূত্রীয় বা মাতৃকুলক্ৰমিক জ্ঞাতি ব্যবস্থায় সন্তানদের বংশ পরিচয় নির্ধারিত হয় মায়ের সূত্রে। নামের শেষে ‘সাংমা’, ‘রেমা’, ‘মানখিন’, ‘দ্রং’ প্রভৃতি উপাধি প্রচলিত। এই উপাধিসমূহ মূলতঃ গোত্রবাচক। প্রথাগতভাবে গারোদের সকলের কাছে মাতৃকুলের পরিচয়টাই অগ্রগণ্য। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একজন গারো নামের শেষে ‘সাংমা’ লিখবে, যদি তার মা ‘সাংমা’ হয়ে থাকে। গারো ভাষায় মাতৃকুলকে বলা হয় ‘মাহারি’। জন্মের পর সন্তানরা মায়ের মাহারির সদস্য বলে গণ্য হয়। একই মাহারিতে বিয়ে নিষিদ্ধ। প্রথাগতভাবে গারো মেয়েরা বিয়ের পরে নিজের বাড়ি বা গ্রামেই বসবাস করত, তাদের স্বামীরা নিজ মাতৃকুল ও গ্রাম ছেড়ে স্ত্রীদের সাথে ঘর করতে আসত।

এই প্রথা পালনের ব্যাপারে আধুনিক গারোদের অনেকের মধ্যে অনীহা লক্ষ্য করা গেলেও তা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায় নি। গারোদের মাতৃসূত্রীয় জ্ঞাতি ব্যবস্থার অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত। প্রথাগতভাবে পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসাবে মেয়েদের মধ্যে একজনকে (সাধারণত সর্বকনিষ্ঠা কন্যা) নির্বাচিত করা হত, গারো ভাষায় যাকে ‘নকনা” বলা হয়। তবে পারিবারিক সম্পত্তির উপর নকনার প্রথাগত অধিকারকে ঠিক ‘ব্যক্তি মালিকানা’ হিসাবে দেখা যায় না, বরং তাকে দেখা যায় সে সম্পত্তির ‘হেফাজত-কারী” হিসাবে।

 

 

যাহোক, এই প্রথার সুযোগ নিয়ে সংখ্যাগুরু বাঙালীদের কেউ কেউ গারো মেয়ে বিয়ে করে তাদের সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়। এ ধরনের সমস্যাসহ নূতন প্রজন্মের গারোদের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে ‘নকনা’ প্রথা কিছুটা শিথিল হয়েছে। তবে বিভিন্ন পরিবর্তন সত্ত্বেও গারো সমাজের মাতৃসূত্রীয় কাঠামো এখনো বহাল রয়েছে, এবং এই সমাজে নারীরা ঠিক পুরুষদের উপর কর্তৃত্ব না করলেও তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট মর্যাদা ও স্বাধীনতা ভোগ করে।

আরও দেখুনঃ

Exit mobile version