আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় পেলোপনেসীয় যুদ্ধ । পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধ (খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১-৪০৪) হ’ল একটি প্রাচীন গ্রীক যুদ্ধ যা স্পার্টার নেতৃত্বাধীন পেলোপনেসিয়ান লিগের বিরুদ্ধে এথেন্সের নেতৃত্বাধীন দেলিয়ান লীগ দ্বারা লড়াই করেছিল।
পেলোপনেসীয় যুদ্ধ (খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১-৪০৪ অব্দ)

গ্রীসীয়-পারসিক যুদ্ধ শেষ হবার অর্ধ শতাব্দী পরেই গ্রীক জগৎ আরেকটি বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। গ্রীক নগররাষ্ট্র সমূহের দুটো প্রধান জোটের মধ্যে রেষারেষিই এ যুদ্ধের প্রধান কারণ । খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গ্রীক জগতে পেলোপনেসীয় লীগ এবং এথেনীয় সাম্রাজ্য- এ দুটো প্রধান জোটের উদ্ভব হয়েছিল। পেরিক্লিসের নেতৃত্বে এথেনীয় সাম্রাজ্য গৌরবের শিখরে আরোহণ করেছিল।
কিন্তু এথেন্স যখন শুধু ঈজিয়ান সাগরে আধিপত্য বিস্তার করেই সন্তুষ্ট থাকল না, গ্রীসের পশ্চিম উপকূল এবং ইটালি সিসিলিতে পশ্চিম সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্নও দেখতে শুরু করল তখন স্পার্টা শঙ্কিত হয়ে উঠল। এথেন্স যখন পেলোপনেসীয় লীগের অন্তর্ভুক্ত কোনো কোনো নগরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা শুরু করল তখন স্পার্টা তীব্রভাবে বাধা দিল। এথেন্সের লক্ষ্য ছিল করিন্থ উপসাগরের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা। কারণ,ইটালি ও সিসিলির সাথে বাণিজ্যের এটাই ছিল প্রধান পথ।
স্বার্থের দ্বন্দ্ব ছাড়াও রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য স্পার্টা এবং এথেন্সের মধ্যে সংঘাতের সূচনা করেছিল। এথেন্স ছিল গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং উন্নত সংস্কৃতির অধিকারী, আর স্পার্টা ছিল অভিজাততান্ত্রিক, রক্ষণশীল, পশ্চাৎমূখী এবং অনুন্নত সংস্কৃতির অধিকারী। ফলে এ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে পরস্পরের প্রতি মনোভাব ছিল খুবই বিদ্বেষমূলক। এথেন্স স্পার্টানদের অশিক্ষিত ও সংস্কৃতিবর্জিত জাতি হিসাবেই বিবেচনা করত।
আর স্পার্টানদের অভিযোগ ছিল যে, এথেন্স পেলোপনেসাস-এর হেলটদের বিদ্রোহে উস্কানি দেয় এবং গণতান্ত্রিক অংশকে সমর্থন করে। অপর পক্ষে স্পার্টা নিজেই এথেনীয় নগরসমূহের অভিজাত অংশকে সমর্থন প্রদান করত। এ পরিস্থিতিতে এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয় সেটি ‘পেলোপনেসীয় যুদ্ধ’ নামে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে। প্রচীন গ্রীসের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।
সাতাশ বছর স্থায়ী এ যুদ্ধে এথেন্স এবং স্পার্টা উভয়েরই অপরিমেয় ক্ষতি সাধিত হয়েছিল এবং সমস্ত গ্রীক জগৎ সঙ্কটে নিমজ্জিত হয়েছিল। ৪৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্পার্টানরা এথেন্স আক্রমণ করলে পেলোপনেসীয় যুদ্ধ শুরু হয়। করিন্থের সাথে এথেন্সের বিবাদকে উপলক্ষ করে স্পার্টা এ যুদ্ধ শুরু করে (করিন্থ ছিল স্পার্টার মিত্র)।
পেরিক্লিসের নেতৃত্বে এথেনীয় বাহিনী সম্মুখ যুদ্ধ এড়িয়ে নগরের দুর্গে আশ্রয় নেয়। স্পার্টনরা যখন এ্যাটিকার শস্যক্ষেত্র এবং ঘরবাড়ি নষ্ট করতে শুরু করে তখন সব মানুষ এসে এথেন্স নগরে আশ্রয় নেয় । ফলে নগরে খাদ্যের অভাব এং নানা রকম রোগ, মহামারী দেখা দেয়। এ ভাগ্যবিপর্যয়ের ফলে পেরিক্লিস জনসাধারণের আস্থা হারিয়ে ফেলেন। এর অল্পকাল পরেই ৪২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পেরিক্লিস রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
পরবর্তী সমর নায়কদের নেতৃত্বে এথেনীয় নৌবাহিনী স্পার্টার কোনো কোনো অংশ অধিকার করে নেয়। স্পার্টাও গ্রীসের উত্তরাঞ্চলে কিছু কিছু এথেনীয় নগর অধিকার করে নেয়। অবশেষে এক বড় যুদ্ধে উভয় পক্ষই শক্তিক্ষয়ের ফলে অবসন্ন হয়ে পড়ায় ৪২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দুই দলের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়। কিন্তু এ শান্তি স্থায়ী হয়নি। অল্পকাল পরেই এথেন্সে সমরবাদী দল সিসিলি দ্বীপের সায়রাকিউজ নগর আক্রমণের প্রস্তাব করে এবং দক্ষিণ ইটালি অধিকারের পরিকল্পনা করে।
সায়রাকিউজ নগররাষ্ট্রটি ছিল করিন্থের উপনিবেশ, আর করিন্থ ছিল পেলোপনেসীয় লীগের সদস্য। ৪১৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলসিবিয়াডিস নামক সমরনায়কের নেতৃত্বে এথেনীয় বাহিনী আড়াই শতাধিক যুদ্ধজাহাজ এবং ৪০ হাজার সৈন্য নিয়ে সায়রাকিউজ আক্রমণ করে। কিন্তু এ অভিযানের ফল এথেন্সের পক্ষে শুভ হয়নি। স্পার্টা এবং সিসিলির মিলিত বাহিনীর হাতে এথেন্স নৌযুদ্ধে পারজিত হয়।
তদুপরি এথেন্সের দুর্ভাগ্যক্রমে অন্তর্কলহের কারণে আলসিবিয়াডিস দলত্যাগ করে স্পার্টার পক্ষে যোগ দেন। পরাজিত এথেনীয় বাহিনী স্থলপথে পশ্চাদপসরণের চেষ্টা করে, কিন্তু সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সিসিলীয়রা এথেনীয় সৈন্যদের বন্দী করে দাসে পরিণত করে। এভাবে পেলোপনেসীয় যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব শেষ হয়। সিসিলীয় অভিযানে বিপর্যস্ত হবার ফলে এথেন্সের নৌশক্তি ভেঙে পড়ে এবং অনেক নগর এথেন্সের কবল থেকে বেরিয়ে যায়।

ইতিমধ্যে এথেন্স অপর এক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ৪১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্পার্টা এ্যাটিকাতে সৈন্য সমাবেশ করে। এ সময় ২০ হাজার এথেনীয় দাস স্পর্টানদের পক্ষে চলে গেলে এথেন্স আরও দূর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে গণতন্ত্রবিরোধীরা এথেন্সে ক্ষমতা দখল করে এবং গণতান্ত্রিক সংবিধান বাতিল করে। এ সংবাদ এথেনীয় নৌবহরে পৌঁছালে নাবিকরা আলসিবিয়াডিস-এর নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে এথেন্সের অভিজাততন্ত্রকে পরাজিত করে।
আলসিবিয়াডিস ইতিমধ্যে স্পার্টার পক্ষ ত্যাগ করে। গ্রীসীয় যুদ্ধের এ পর্যায়ে পারসিক রাজশক্তি স্পার্টার পক্ষ নিয়ে নতুন করে গ্রীসীয় যুদ্ধে প্রবেশ করে। পারস্যের লক্ষ্য ছিল এশিয়া মাইনরের উপকূলে তার আধিপত্য ও সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। যুদ্ধে পারস্যের প্রবেশের ফলে সমুদ্র পথে এথেন্সে শস্য আমদানির পথ বন্ধ হয়ে গেল। স্পার্টার আক্রমণের ফলে এ্যাটিকায় শস্যের চাষও এক রকম বন্ধ ছিল।
এ অবস্থায় দার্দানেলিসে এথেনীয় নৌবহর স্পার্টানদের হাতে বিধ্বস্ত হওয়ায় এথেনীয় শক্তি চূড়ন্তভাবে পর্যুদস্ত হল। এরপর ৪৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্পার্টানরা এথেন্স অধিকার করে এথেন্সের সব যুদ্ধজাহাজ বাজেয়াপ্ত করে এবং এথেন্স থেকে পাইরিউস পর্যন্ত বিস্তৃত সুদীর্ঘ প্রাচীর ভেঙে ফেলে। এথেন্স এর পর স্পার্টার আধিপত্য ও নেতৃত্ব স্বীকার করে নেয়। স্পার্টার সেনাবাহিনীর সহায়তায় এথেন্সের গণতন্ত্রবিরোধীরা স্বৈরাচারের প্রবর্তন করেছিল, কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি।
৪০৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এথেন্সে আবার গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পেলোপনেসীয় যুদ্ধে সব চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এথেন্স। তার কৃষককুল সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল; ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তবে যুদ্ধের ফলে স্পার্টাও কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। পেলোপেনেসীয় যুদ্ধের মাধ্যমে স্পার্টানরা গ্রীক জগতের সর্বপ্রধান শক্তিতে পরিণত হলেও, স্পার্টা ছিল এ ভূমিকা পালনে একান্তই অপারগ।
এ দিকে পারসিকরা ইতিপূর্বে যুদ্ধে স্পার্টানদের যে সাহায্য প্রদান করেছিল তার বিনিময়ে এখন এশিয়া মাইনরের গ্রীক নগরগুলো দাবি করে বসে। স্পার্টা এ দাবি অগ্রাহ্য করলে পারসিকরা বিভিন্ন গ্রীক নগররাষ্ট্রকে নিয়ে স্পার্টার বিরুদ্ধে একটা জোট গঠন করে। এভাবে নতুন করে ‘করিন্থের যুদ্ধ’ শুরু হয়। যুদ্ধশেষে যে শান্তিচুক্তি হয় তাতে স্পার্টার প্রাধান্য মেনে নেয়া হলেও গ্রীসের বিভিন্ন সমস্যায় পারস্য সম্রাটকে প্রধান সালিস হিসাবেও স্বীকার করে নেয়া হয়।
এরপর স্পার্টা বিভিন্ন নগর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে থাকে। স্পার্টার সৈন্যদলের সহায়তা নিয়ে সব নগররাষ্ট্রের অভিজাততন্ত্রীরা গণতন্ত্র উচ্ছেদ করে অভিজাততন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। স্পার্টা প্রায় তিরিশ বছর ধরে সারা গ্রীসের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়। তারপর থিবস্ নগররাষ্ট্র এথেন্সের সাথে জোট গঠন করে স্পার্টার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায়। ৩১৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে থিবস্ ও স্পার্টার মধ্যে এক যুদ্ধ হয়।
এ যুদ্ধে থিস-এর সেরা সেনাপতি এপামিননডাস-এর নতুন রণকৌশলের কাছে অপরাজেয় স্পার্টান বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এর পর স্পার্টা গ্রীকজগতের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে এবং শুরু হয় থিস-এর আধিপত্যের যুগ। কিন্তু থিস-এর ক্ষমতা স্থায়ী হয়নি,৩৬২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এপামিননডাসের মৃত্যুর সাথে সাথে থিস-এর প্রতিপত্তির অবসান ঘটেছিল। ইতিমধ্যে গ্রীসের উত্তরাঞ্চলের ম্যাসিডোনিয়া রাজ্য নতুন শক্তি নিয়ে জেগে ওঠে এবং সমগ্র গ্রীকজগতের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

দেখা যাচ্ছে পেলোপনেসীয় যুদ্ধ গ্রীকজগতের স্থিতিশীলতাকে দারুণভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিভিন্ন নগররাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তীব্র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলেছিল। এ সময় বিভিন্ন নগররাষ্ট্র নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করার চেষ্টা করে, কিন্তু কেউই বেশিদিন প্রাধান্য বজায় রাতে পারেনি। এ সময়ে এক সর্বব্যাপী বিক্ষোভ ও অস্থিরতা সমগ্র গ্রীকসমাজকে আলোড়িত করেছিল যার প্রতিফলন ঘটেছিল অর্থনৈতিক অবক্ষয়ে এবং নগরে নগরে বিরামহীন যুদ্ধে।
আরও দেখুন :
