আজকে আমরা আলোচনা করবো পরিবার ও গৃহস্থালী নিয়ে । ঊনবিংশ শতকের বিবর্তনবাদীদের পরিবারের উৎস খোঁজার প্রচেষ্টা পরবর্তী সময়ে সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিল। বিংশ শতকের প্রথম অর্ধেক পর্যন্ত একরৈখিক বংশীয় দল নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন বৃটিশ নৃবিজ্ঞানীগণ।
পরিবার ও গৃহস্থালী

এই সময়ে নৃবিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রধান বিতর্ক ছিল বংশীয় দলের রাজনৈতিক-আইনী বা বিচারশাস্ত্রীয় দিকগুলো নিয়ে। এ কারণে পরিবার বা গৃহস্থালী নৃবিজ্ঞানীদের কাজে, তাঁদের চিন্তা-ভাবনায় তেমন গুরুত্ব পায়নি। এসব বিষয়ের প্রতি নৃবিজ্ঞানীরা মনোযোগী হয়ে ওঠেন ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকে। “পরিবার” এবং “গৃহস্থালী” এ দুটো এক নয়, এটাই ছিল প্রথম ভাবনার জায়গা।

পরিবার সংজ্ঞায়নে নৃবিজ্ঞানীরা জোর দেন বিয়ে, স্বামী-স্ত্রীর একত্রে বসবাস, এবং সন্তান লালন-পালনের উপর । গৃহস্থালী সংজ্ঞায়িত হয় “আবাসস্থলের একক” হিসেবে। আপনি পূর্বেই জেনেছেন শুরু থেকে নৃবিজ্ঞান ছিল পাশ্চাত্য সমাজের একটি জ্ঞানকান্ড, যেই জ্ঞানকান্ডের বিষয়বস্তু ছিল অপাশ্চাত্যের মানুষজন: তাদের সমাজ ও সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, তাদের আচার-আচরণ, মূল্যবোধ ও বিশ্বাস। আপনারা এও জেনেছেন: পাশ্চাত্য সমাজের মানুষজন যখন ভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতির মানুষজনের মুখোমুখি হন, তারা বহুলাংশেই সেই সমাজগুলোকে তাঁদের নিজেদের সমাজের মাপকাঠি অনুসারে বিচার-বিশ্লেষণ করেন।

বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ এতে নানান ধরনের ধারণাগত বিভ্রান্তি তৈরী হয়। পরিবার এবং গৃহস্থালী সংজ্ঞায়নে কি ধরনের তাত্ত্বিক সমস্যা সৃষ্ট হয় সেটা এই পাঠের প্রথম অংশে আলোচিত হবে। বর্তমান সময়ে নৃবৈজ্ঞানিক জ্ঞানকান্ড এসব বিষয়ের মুখোমুখি হওয়া জরুরী মনে করছে।

পরিবার ও গৃহস্থালী অধ্যায়ের সারাংশ:
আজকের আলোচনার বিষয় পরিবার ও গৃহস্থালী অধ্যায়ের সারাংশ -তত্ত্ব অধ্যায়ের সারাংশ – যা পরিবার ও গৃহস্থালী এর অর্ন্তভুক্ত, পরিবার এবং গৃহস্থালী নৃবিজ্ঞানীদের মনোযোগ পেয়েছে বহু পরে, বিংশ শতকের শেষ অর্ধে। পরিবার এবং গৃহস্থালী নিয়ে যেসব তত্ত্ব তৈরির কাজ, এবং মাঠগবেষণা ভিত্তিক কাজ শুরু হয় তা পরবর্তী কালে জাত্যাভিমানাত্মক হওয়ার কারণে সমালোচনার সম্মুখীন হয়।

নৃবিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন পরিবারের কিছু আকর বৈশিষ্ট্য আছে, পরিবার কিছু আকর ভূমিকা পালন করে, যা বিশ্বের যাবতীয় ভিন্নতাকে (বিশ্বের এক অঞ্চল হতে আরেক অঞ্চলের সামাজিক এবং কৃষ্টিগত ভিন্নতা) ছাপিয়ে যায়। সমালোচকদের দৃষ্টিতে, যে বিশ্বজনীন সংজ্ঞা দাঁড় করানো হয়েছিল সেগুলো ছিল পার্শ্বিক; এই সংজ্ঞাগুলোর ভিত্তি ছিল পাশ্চাত্য সমাজের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, সেখানকার ঘটনা।

পাশ্চাত্য সমাজে যা স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তার ভিত্তিতে নৃবিজ্ঞানীরা তৈরী করেন পরিবার এবং গৃহস্থালীর বিশ্বজনীন সংজ্ঞা। হাল আমলের কিছু নৃবিজ্ঞানী মনে করেন যে, এ ধরনের নৃবৈজ্ঞানিক কাজ পাশ্চাত্য সমাজকে বিশ্বের সাংস্কৃতিক মানদন্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে।

কেস স্টাডি : পরিবার ও গৃহস্থালী সংক্রান্ত জাপানী সাংস্কৃতিক প্রত্যয়:
আজকের আলোচনার বিষয় কেস স্টাডি : পরিবার ও গৃহস্থালী সংক্রান্ত জাপানী সাংস্কৃতিক প্রত্যয় – তত্ত্ব অধ্যায়ের সারাংশ – যা পরিবার ও গৃহস্থালী এর অর্ন্তভুক্ত, মজার ব্যাপার হল, জাপানে পরিবার এবং গৃহস্থালী একেবারে ভিন্ন। শুধু তাই নয়, জাপানে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক প্রত্যয় আছে যা কিনা মানুষজনকে নানান দলে অন্তর্ভুক্ত করে।

জাপানি জ্ঞাতি দল, বা বসবাসকারী এককের ধারণা পাশ্চাত্য সমাজের পরিবার এবং গৃহস্থালীর ধারণা বা অনুশীলন হতে একেবারে ভিন্ন। “শতাই” (shotai) হচ্ছে তারা যারা একসাথে জীবনযাপনের খরচপাতি করে থাকে। এমনও হতে পারে, তাদের মধ্যে কোন জ্ঞাতি সম্পর্ক নেই। “কাজোকু” (kazoku) হচ্ছে এমন একটি দল যাদের মধ্যে ঐক্য আছে।

তারা একত্রে বসবাস নাও করতে পারে। যেমন ধরুন প্রাপ্ত বয়স্ক পুত্র যে বাবা-মা’র সাথে থাকে না কিন্তু সে কাজোকুর অন্তর্ভুক্ত। “ইয়ে” (ie) বলতে বোঝায় বাড়ি (দালান-কোঠা অর্থে) এবং এর একাধিক মৃত, এবং বর্তমান, প্রজন্ম। প্রতি প্রজন্মে থাকবে শুধুমাত্র একটি বিবাহিত দম্পতি। “দোজকু” (dozoku) হচ্ছে আরো বড়সড় জ্ঞাতি দল। এর অন্তর্ভূক্ত ইয়ে এবং ইয়ে’র দুই একটি শাখা (ধরুন আরেকজন পুত্র ও তার পরিবার) কিন্তু সকল শাখা-প্রশাখা না। “শিন্সকেই” (shinskei) তে অন্তর্ভূক্ত ইয়ে এবং বিবাহিত কন্যাসকল।

এখন প্রশ্ন হল: জাপানি জ্ঞাতি ব্যবস্থায় কোনটাই বা “পরিবার” আর কোনটাই বা “গৃহস্থালী”? পরিবার এবং গৃহস্থালী থাকতে বাধ্য, সকল সমাজে এগুলো আছে, এভাবে না এগিয়ে হাল আমলের কিছু নৃবিজ্ঞানীর মনে হবে, জাপানি সাংস্কৃতিক প্রত্যয়ের সাহায্যে জাপানি সামাজিক সংগঠন বুঝতে চেষ্টা করাটা আরো অর্থবহ। বিষয়টি নিয়ে আপনাকে ভাবতে অনুরোধ করছি।
আরও দেখুনঃ
