আজকের আলোচনা চাকমাদের সাধারণ পরিচিতি নিয়ে। সাধারণভাবে ‘পাহাড়ী’ নামে পরিচিত যে ১১টি জাতিসত্তা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করছে, তাদের মধ্যে চাকমারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সবচাইতে সুপরিচিত। অবশ্য আগেই যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষিতে নয়, গোটা বাংলাদেশেই চাকমারা হল বৃহত্তম আদিবাসী সম্প্রদায়।
চাকমাদের সাধারণ পরিচিতি
তবে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে নয়, সাক্ষরতার ক্ষেত্রে অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের তুলনায় এগিয়ে থাকার কারণে চাকমাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে কর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে, এবং বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও অনেক চাকমা ছাত্রছাত্রী পড়াশুনা করছে, ফলে দেশে তাদের একটা সাধারণ পরিচিতি গড়ে উঠেছে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন যাবত পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্ত্ব শাসনের লক্ষ্যে জনসংহতি সমিতি পরিচালিত সশস্ত্র সংগ্রামের সূত্রে আন্তর্জাতিকভাবেও চাকমারা বিশেষভাবে পরিচিতি পেয়েছে, যেহেতু পাহাড়ীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ তথা শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসাবে চাকমারাই এই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিল।
১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুসারে এদেশে চাকমা জনসংখ্যা ছিল আড়াই লক্ষাধিক। তবে সেসময় ভারতে আশ্রিত শরণার্থীরা যারা পরে দেশে ফিরে এসেছে তাদের হিসাব ও স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির | মত বিষয় বিবেচনায় ধরলে এ সংখ্যা বর্তমানে আরো বেশী হবে। চাকমা জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম অংশের বসবাস রয়েছে রাঙ্গামাটি জেলায়, এবং এরপর খাগড়াছড়িতে। বান্দরবান জেলায় চাকমাদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। বর্তমানে বাংলাদেশের বাইরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরাম, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশে অনেক চাকমা স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, যাদের বড় অংশই কাপ্তাই বাঁধের ফলে স্থানচ্যুতিসহ বিভিন্ন কারণে পাকিস্তান আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ঐ সমস্ত অঞ্চলে অভিবাসিত হয়েছিল।
চাকমা জনগোষ্ঠী অধ্যায়ের সারাংশ:
আজকের আলোচনার বিষয় চাকমা জনগোষ্ঠী অধ্যায়ের সারাংশ – যা চাকমা জনগোষ্ঠী এর অর্ন্তভুক্ত, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসরত চাকমারা বাংলাদেশের বৃহত্তম আদিবাসী সম্প্রদায়, যারা শিক্ষাদীক্ষায়ও বর্তমানে অপেক্ষাকৃত অগ্রসর। বাংলাদেশের বাইরে ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশেও চাকমাদের বসবাস রয়েছে, যাদের অনেকে কাপ্তাই বাঁধের ফলে স্থানচ্যুত হয়ে অভিবাসী হয়েছিল।
মুগল শাসনামল বা আরো আগে থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাকমাদের বসবাস ছিল, যেখানে কিংবদন্তী অনুসারে ‘চম্পকনগর’ নামক একটি স্থান থেকে তাদের আগমন ঘটেছিল। ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে অন্যান্য পাহাড়ী জনগোষ্ঠীদের মত চাকমারাও অর্থনৈতিকভাবে মূলতঃ জুমচাষের উপরই নির্ভর করত।
তবে ব্রিটিশ শাসনামলে চাকমাদের অনেকে লাঙল চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যাদের একটা বড় অংশ কাপ্তাই বাঁধের ফলে স্থানচ্যুত হয়েছিল। চাকমাদের বেশীরভাগ এখন আর জুমচাষ না করলেও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাকমাদের সংস্কৃতি চেতনায় জুমিয়া ঐতিহ্যের গুরুত্ব রয়েছে। অন্য যে কোন সংস্কৃতির মত চাকমা সংস্কৃতিও পরিবর্তনশীল একটি ব্যবস্থা যেখানে বিভিন্ন ঐতিহ্যের সমন্বয় লক্ষ্যণীয়।
চাকমা সমাজে বিভিন্ন গোত্র থাকলেও বর্তমানে গোত্র পরিচয়ের চাইতে শ্রেণীগত অবস্থানই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। আর বর্তমান চাকমা সমাজে ব্যক্তির শ্রেণীগত অবস্থান নিরূপণে সামন্ত বা ঔপনিবেশিক আমলের বংশমর্যাদার চাইতে শিক্ষা, পেশা, বিত্ত ইত্যাদির গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়।
আরও দেখুনঃ
