আজকের আলোচনার বিষয় চাকমাদের ইতিহাস – যা চাকমা জনগোষ্ঠী এর অর্ন্তভুক্ত, চাকমাদের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে কয়েক শতাব্দী আগের প্রেক্ষিতে বিস্তারিত ও | বস্তুনিষ্ঠ কোন তথ্য পাওয়া যায় না। অবশ্য শুধু চাকমাদের বেলাতেই নয়, অন্যান্য প্রায় সকল আদিবাসী জাতিসত্তা, এমন কি খোদ বাঙালী জাতির ক্ষেত্রেই কথাটা অনেকখানি প্রযোজ্য। কারণ, প্রথাগত ইতিহাস চর্চায় বিভিন্ন রাজা-বাদশা বা অন্যান্য সামন্তপ্রভুদের কর্মকান্ডের প্রতি যতটা মনোযোগ দেখা গেছে, সে তুলনায় সামগ্রিকভাবে একটা জাতিসত্তা কিভাবে গঠিত হয়, এর বিকাশ বা ঐতিহাসিক রূপান্তর কিভাবে ঘটে, এ ধরনের বিষয়ে তেমন গবেষণা হয় নি।
তার উপর একটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসাবে অপরাপর আদিবাসী সম্প্রদায়সমূহের মতই চাকমারাও এদেশের মূলধারার ইতিহাস চর্চায় অনেকটাই উপেক্ষিত রয়ে গেছে। চাকমাদের সম্পর্কে যেসব ঐতিহাসিক তথ্য আমরা পাই, তার অনেকটা মূলতঃ লিপিবদ্ধ হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসকদের হাতে। অবশ্য সাম্প্রতিককালে শিক্ষিত চাকমাদের একটা অংশও নিজেদের ইতিহাস অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছেন, যাঁরা এই জাতির অতীত সম্পর্কে অজানা বা স্বল্প-জানা অনেক তথ্য, ধারণা বা তত্ত্ব হাজির করছেন, যদিও ক্ষেত্রবিশেষে ইতিহাসের সাথে কিংবদন্তী ও কল্পনার ভেদরেখা স্পষ্ট করা সম্ভব নয়। যাহোক, নীচে বিভিন্ন সূত্র অবলম্বনে চাকমা জাতির ইতিহাসের কিছু সাধারণ দিকের উপর আলোকপাত করা হল।
চাকমাদের ইতিহাস
ঠিক কবে থেকে ‘চাকমা’ পরিচয়ধারী একটি জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে, এ বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায় না, তবে মুগল শাসনামলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে নিশ্চিতভাবেই চাকমাদের বসবাস ছিল, এবং সেখানে তাদের আবির্ভাব আরো আগেই ঘটেছিল বলে ধরে নেওয়া যায়। চাকমাদের মধ্যে প্রচলিত কিংবদন্তী অনুসারে চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল ‘চম্পকনগর’ নামক একটি স্থান, তবে এর সত্যতা বা সঠিক অবস্থান সম্পর্কে কোন নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। চাকমাদের একাধিক পালাগানে বিজয়গিরি নামে এক রাজার যুদ্ধাভিযান, বিশেষ করে তাতে অংশগ্রহণকারী সেনাপতি রাধামন ও তার প্রেমিকা ধনপুদির কাহিনী বিবৃত রয়েছে।
রাজা বিজয়গিরিকে চাকমা রাজাদের একজন আদিপুরুষ হিসাবে গণ্য করা হয়, তবে কিংবদন্তীর এই চরিত্র ও ঘটনাবলীর পেছনে কবেকার কোন্ ঐতিহাসিক সত্য লুকিয়ে আছে, তাও এখনো নিঃসংশয়ভাবে নিরূপিত হয় নি। অতীতে চাকমা রাজারা নিজেদের ‘শাক্য-বংশীয়’ (যে বংশে গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল) হিসাবে দাবী করতেন, তবে এই দাবীর সামাজিক ও প্রতীকী তাৎপর্য থাকলেও তার পেছনে কোন বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে, এমন প্রমাণ নেই।
চট্টগ্রামে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে এই অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে যে দুইটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ছিল, আরাকান ও ত্রিপুরা, তাদের উত্থান পতনের সাথে চাকমা জাতির ইতিহাস অনেকটা সম্পর্কিত ছিল বলে মনে করা হয়। চাকমাদের একটা বড় অংশ একসময় আরাকান রাজ্যের প্রভাবাধীন চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল বাস করত বলে মনে হয়, তবে তার আগে তারা সেখানে উত্তর দিক থেকে গিয়ে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। বর্তমানেও আরাকানে ‘দৈংনাক’ নামে অভিহিত একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে বলে জানা যায় যেটাকে তঞ্চঙ্গ্যা তথা চাকমাদের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ হিসাবে গণ্য করা হয়।
(উল্লেখ্য, তঞ্চঙ্গ্যারা বর্তমানে একটি স্বতন্ত্র উপজাতি হিসাবে বিবেচিত হলেও তারা চাকমাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।) যাই হোক, ব্রিটিশ শাসনের প্রাক্কালে অর্থাৎ মোগল শাসনামলে চাকমাদের মূল আবাস ছিল চট্টগ্রাম অঞ্চলে। চাকমা রাজারা মোগল শাসকদের ‘কার্পাস কর’ দিত, এবং সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে তাদের অনেকে অভিজাত মুসলিম শাসকদের অনুকরণে “খাঁ’ পদবী সম্বলিত নাম ব্যবহার করতেন – যেমন, জন্মাল খাঁ, জান বক্স খাঁ প্রভৃতি। ‘রাজা’ হিসাবে অভিহিত হলেও তাঁরা অবশ্য পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোন রাজ্যের অধিপতি ছিলেন বলে মনে হয় না, তবে চাকমা জনগোষ্ঠীর উপর তাঁদের কর্তৃত্ব ছিল এবং কখনো কখনো চাকমা রাজারা মোগল ও পরবর্তীতে ব্রিটিশ রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৮৬০ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা সৃষ্টির পর সেখানে যে তিনটি ‘সার্কেল’ চিহ্নিত করা হয়, তার একটি ছিল ‘চাকমা সার্কেল’ (যার সীমানায় বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলার বেশীর ভাগ এলাকা এবং খাগড়াছড়ি জেলার কিয়দংশ অবস্থিত)। মূলতঃ চাকমা-অধ্যুষিত এই সার্কেলের চীফ পদটি স্বাভাবিকভাবেই চাকমা রাজ পরিবারের জন্য নির্ধারিত হয়। ব্রিটিশ শাসনের গোড়াতে চন্দ্রঘোনা ছিল জেলা সদর, তবে ১৮৬৮ সালে তা রাঙ্গামাটিতে স্থানান্তরিত হয়, যে পদক্ষেপ চাকমা জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। রাজপরিবার সহ চাকমা জনগোষ্ঠীর মূল কেন্দ্র ছিল রাঙ্গামাটি, যেখানে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ঐতিহাসিকভাবে চাকমা সমাজে সাক্ষরতা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে অন্যান্য পাহাড়ী জনগোষ্ঠীদের মত চাকমারাও অর্থনৈতিকভাবে মূলতঃ জুমচাষের উপরই নির্ভর করত। তবে ব্রিটিশরা বিভিন্ন পন্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষের পরিধি কমিয়ে তার পরিবর্তে লাঙল চাষের প্রসার ঘটানোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, যে পরিবর্তনে চাকমা জনগোষ্ঠীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ শামিল হয়েছিল।
বিশেষ করে রাঙ্গামাটিসহ কর্ণফুলী নদীর অববাহিকা বরাবর বেশ কিছু সমৃদ্ধ চাকমা জনপদ গড়ে উঠেছিল। তবে ১৯৬০-এর দশকে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে এই জনপদসমূহের অধিকাংশ হ্রদের নীচে তলিয়ে যায়, এবং এতে প্রায় এক লক্ষের মত যেসব মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছিল, তাদের অধিকাংশ ছিল চাকমা সম্প্রদায়ভুক্ত। সেসময় স্থানচ্যুত চাকমাদের অনেকে বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন অংশসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য অঞ্চলে চলে যেতে বাধ্য হয়, এবং বাকীরা স্থায়ীভাবে দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। উল্লেখ্য, এদের মধ্যে যারা ভারতীয় কতৃপক্ষ কর্তৃক অরুণাচল প্রদেশে পুনর্বাসিত হয়েছিল, তারা এখনো সেদেশের পূর্ণ নাগরিকত্ব পায়নি।
১৯৯৭ সালে ‘শান্তি চুক্তি’ সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত জনসংহতি সমিতি নামক একটি সংগঠনের নেতৃত্বে পাহাড়ীরা স্বাধিকারের দাবীতে দুই দশকের বেশী সময় ধরে যে সশস্ত্র আন্দোলন চালিয়েছিল, অনেক বিশ্লেষকের মতে তার একটি অন্যতম উৎস নিহিত রয়েছে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ঘটনায়। এই বাঁধের ফলে ব্যাপক স্থানচ্যুতির অভিজ্ঞতাসহ পাহাড়ীদের চোখে তাদেরকে নিজভূমে পরবাসী করার বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ তাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে বিশেষভাবে বিচলিত করেছিল। পাহাড়ীদের মধ্যে এই শ্রেণীর বিকাশ সবচাইতে বেশী ঘটেছিল চাকমাদের মধ্যে, ফলে তাদের মধ্য থেকে গড়ে উঠেছে পাহাড়ীদের পরবর্তীকালের আন্দোলনের মূল স্রোত।
আরও দেখুনঃ
