আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় পেরিক্লিসের যুগ। পেরিক্লিস (প্রাচীন গ্রিক ভাষা: Περικλῆς পেরিক্ল্যাস্, অর্থাৎ “মহিমান্বিত”, ৪৯৫ খ্রীস্টপূর্ব-৪২৯ খ্রীস্টপূর্ব) ছিলেন গ্রিক সভ্যতার স্বর্ণযুগে এথেন্স নগরের একজন প্রভাবশালী ও মান্যগণ্য নেতা, বক্তা এবং সেনাপতি। পারস্য ও পেলোপনেস যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি আল্কমেনিডি পরিবারের সদস্য ছিলেন।
পেরিক্লিসের যুগ

পেরিক্লিসের যুগ
ডেলিয়ান লীগ কালক্রমে এথেনীয় সাম্রাজ্যে পরিণত হবার ফলে এথেন্সের রাষ্ট্রশক্তি, প্রশাসনব্যবস্থা, সমাজজীবন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অপূর্ব বিকাশ লাভ করে। সাথে সাথে এথেন্সে গণতন্ত্রেরও বিকাশ ঘটে। এথেন্সের ইতিহাসে এ ছিল এক স্বর্ণযুগ। পেরিক্লিস নামক অভিজাত বংশীয় একজন এথেনীয় নাগরিকের নেতৃত্বে এথেন্সের এরূপ অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল বলে এ যুগ ‘পেরিক্লিসের যুগ’ নামেও পরিচিত হয়েছে।
গ্রীসীয়-পারসিক যুদ্ধের ফলে এথেনীয় নৌবহরের যে বিকাশ ঘটেছিল তা ছিল এথেন্সে গণতন্ত্রের বিকাশের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এথেনীয় পদাতিক বাহিনীতে যারা যোগদান করত তাদের নিজেদের দেহবর্ম নিজ খরচে সংগ্রহ করতে হত। এ সকল দেহবর্ম যথেষ্ট ব্যয়বহুল হবার দরুন অবস্থাপন্ন লোক ছাড়া আর কেউ সৈন্যদলে যোগ দিতে পারত না। কিন্তু নৌবহরের নাবিকদের এ রকম কোনো দেহবর্ম দরকার হত না।
তাই নৌবহরের নাবিক, মাঝি-মাল্লা প্রভৃতি নেয়া হত দরিদ্র জনসাধারণ থেকে। যুদ্ধে নৌবহরের গুরুত্ব যত বাড়ল এবং নৌবহরের আয়তন যত বাড়ল, এথেন্সের রাজনীতিতেও সাধারণ স্তরের মানুষদের প্রভাব ততই বাড়তে লাগল। ফলে সোলোন এবং ক্লিথেনিসের গণতান্ত্রিকসংস্কার সমূহকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হল। পেরিক্লিসের আমলে এথেন্স ক্ষমতা ও সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল।

অধীনস্থ নগরসমূহের কাছ থেকে যে বিপুল পরিমাণ কর আদায় হত, সে অর্থে এথেন্স তার এ্যাক্রোপলিসে সুন্দর সুন্দর ভবন, মন্দির, তোরণ সৌধ, ভাস্কর্য প্রভৃতি নির্মাণ করেছে। এ সকলের মধ্যে এথেন্সের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ‘এথেনার’ মন্দির ‘পার্থেনন্’ সবচেয়ে বিখ্যাত। এ মন্দিরের মধ্যে দেবী এথেনার এক সুবিশাল প্রতিমূর্তি ছিল, সেটা নির্মাণ করেছিলেন সুবিখ্যাত ভাস্কর ‘ফিডিয়াস’। তা ছাড়া এথেন্সে কবি, নাট্যকার, দার্শনিক, বাগ্মী প্রভৃতির সমাবেশ ঘটেছিল।
এঁদের মধ্যে অনেকে এথেনীয়, অনেকে আবার গ্রীসের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এথেন্সে উপস্থিত হয়েছিলেন। সুবিখ্যাত দার্শনিক ও পণ্ডিতরা এথেন্সে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। এথেন্সের থিয়েটার (উন্মুক্ত রঙ্গমঞ্চ) ছিল গ্রীসের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। পেরিক্লিস তাঁর চারপাশে সারা গ্রীসের বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও শিল্পী-সাহিত্যিকদের আকৃষ্ট করেছিলেন। এঁদের মধ্যে দার্শনিক এ্যানাক্সাগোরাস, নাট্যকার ইউরিপাইডিস প্রমুখের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
এস্কাইলাস, সোফোক্লিস, এ্যারিস্টফেনিস প্রমুখ নাট্যকারও পেরিক্লিসের এথেন্সের গৌরব বৃদ্ধি করেছিলেন। পেরিক্লিস অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রবর্তন করেছিলেন। পেরিক্লিসের আমলে গণ পরিষদ আইন প্রণয়নের এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার লাভ করে। গণপরিষদ গঠিত হত সমস্ত নাগরিকদের নিয়ে। গণপরিষদের অধিবেশন প্রতি দশ দিন অন্তর অনুষ্ঠিত হত।
এথেন্সের যে কোনো নাগরিক এ অধিবেশনের যে কোনো প্রস্তাব রাখতে বা নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করতে পারতেন। সব রকম প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে গৃহীত হত। প্রত্যেক নাগরিকের সমস্ত রকম রাষ্ট্রীয় উচ্চ পদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার এবং নির্বাচিত হবার অধিকার ছিল। পেরিক্লিসের সময়ে রাষ্ট্রীয় পদসমূহের জন্যে বেতন দেবার প্রথা প্রবর্তিত হবার ফলে দরিদ্র লোকেরাও এ সকল পদে নির্বাচিত হবার সুযোগ পায়।

পরবর্তীকালে গণপরিষদের সদস্যদেরও বেতন দেয়া হত। পেরিক্লিস গরিব লোকদের থিয়েটার দেখার সুযোগ করে দেবার জন্যে ‘থিয়েটার তহবিল’ নামে একটি তহবিল গঠন করেছিলেন। গ্রীসে থিয়েটার শুধু বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল রাজনৈতিক শিক্ষালাভের কেন্দ্রস্বরূপ। গণপরিষদ ছাড়া এথেন্সে ৫০০০ জনের এক পরিষদ ছিল। এর কাজ ছিল আইনের প্রয়োগ যাতে ঠিকমতো ঘটে তার তদারক করা। এথেন্সে আরেকটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা ছিল জেনারেলদের পরিষদ (১০ জনের)।
এর ভূমিকা ছিল অনেকটা আধুনিক ব্রিটিশ মন্ত্রীপরিষদের মতো। গণপরিষদ এঁদের নির্বাচিত ও এঁদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করত। পেরিক্লিস একাদিক্রমে তিরিশ বছর এই জেনারেলদের পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এথেন্সে আদালত এবং বিচারকমণ্ডলীও গণতান্ত্রিক পর্যায়ে নির্বাচিত হতেন। বিচারকরা সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী বিচারের নিষ্পত্তি করতেন। এর চেয়ে অধিকতর কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কল্পনা করা কঠিন।
তবে এথেন্সের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ত্রুটিও ছিল। বিপুলসংখ্যক দাসরা সব রকম অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। বহিরাগত মানুষদেরও কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না। গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করত কেবলমাত্র স্বাধীন এথেনীয় নাগরিকগণ। তার মধ্যেও আবার মেয়েরা সব রকম রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলত, এথেন্সে বা অনুরূপ কোনো গ্রীক নগররাষ্ট্রে গণতন্ত্র শুধুমাত্র জনসাধারণের এক ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে সীমিত ছিল।
কিন্তু এ কারণে গ্রীক গণতন্ত্র বা তার গুরুত্বকে খাটো করে দেখলে ভুল হবে। এ কথা মনে রাখা দরকার যে, সীমিত গণ্ডির ভেতর হলেও আধুনিককালের চেয়ে এথেন্সে গণতন্ত্র অনেক বেশি ব্যাপকভাবে প্রযুক্ত হত। এথেনীয় গণতন্ত্র আধুনিককালের মতো প্রতিনিধিত্বমূলক ছিল না, সেটি ছিল প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র এবং আইনসভা থেকে বিচারালয় পর্যন্ত সর্বত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের নীতি অনুযায়ী সব প্রশ্নের মীমাংসা হত।
জনস্বার্থমূলক প্রতিটি বিষয়ে এথেন্সের প্রতিটি নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকার ছিল। দাসসমাজের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এথেন্স ও অন্যান্য গ্রীক নগররাষ্ট্রে ব্যাপক জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনা এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার লাভ করেছিল বলেই প্রাচীন গ্রীসে বিজ্ঞান, কারিগরি বিদ্যা, দর্শনচিন্তা প্রভৃতির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল।
মিশর, ব্যবিলন, পারস্য প্রভৃতি প্রাচ্য সাম্রাজ্যের স্বৈরাচার শাসিত পরিবেশের তুলনায় গ্রীসের গণতান্ত্রিক সমাজের পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ও উচ্চতর পর্যায়ের। এ গণতান্ত্রিক পরিবেশে প্রাচীন গ্রীসের মানুষদের মধ্যে যে মুক্ত চিন্তা ও মনোভাব জন্ম নিয়েছিল তা ছিল মানব সমাজের পক্ষে এক নতুন সম্পদ। গ্রীসের গণতান্ত্রিক পরিবেশে বন্ধনমুক্ত জনগণ যে অভূতপূর্ব সৃজনশীল প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে তা গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত শক্তিরই পরিচয় বহন করে।

গণতন্ত্রের এ মুক্ত পরিবেশে গ্রীসে যে সকল বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি আবিষ্কার ঘটেছিল তা পরবর্তীকালে সমাজ বিবর্তনের সহায়ক হয়েছে। তাই বলা চলে যে, সমাজ বিকাশের ইতিহাসে, বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও আবিষ্কারের ইতিহাসে, মানুষের চিন্তাধারা ও ভাবাদর্শের ইতিহাসে গ্রীক গণতান্ত্রিক সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে।
আরও দেখুন :
