আদিম সমাজের হাতিয়ার, শিকার কৌশল যানবাহন

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় আদিম সমাজের হাতিয়ার, শিকার কৌশল যানবাহন

আদিম সমাজের হাতিয়ার, শিকার কৌশল যানবাহন

 

আদিম সমাজের হাতিয়ার, শিকার কৌশল যানবাহন

 

আদিম সমাজের হাতিয়ার, শিকার কৌশল যানবাহন

শিকারী মানুষদের পাথরের হাতিয়ারের (হাতকুড়াল, ছুরি, বল্লম ইত্যাদির) কথা আমরা আগে কিছু কিছু বলেছি। উচ্চ পুরোপলীয় যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হচ্ছে বর্শা নিক্ষেপক যন্ত্র এবং তীর-ধনুক। এ দুটো দূরপাল্লার হাতিয়ার আয়ত্ত করার ফলে মানুষের শিকারী গুণ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। কারণ এর ফলে তারা খোলা প্রান্তরে দ্রুতগতিসম্পন্ন প্রাণীদের শিকার করতে পারত।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, নিক্ষেপক যন্ত্রে লিভার বা দণ্ডের সাহায্যে বর্শার গতি ও পাল্লা বাড়ানো হয়েছে। আর ধনুকের ক্ষেত্রে তার ছিলা বা গুণ-এর মধ্যে সঞ্চিত শক্তিকে অকস্মাৎ মুক্ত করে তার সাহায্যে তীর নিক্ষেপ করা হয়। এভাবেই মানুষ বিজ্ঞানের তত্ত্ব আবিষ্কারের অনেক আগেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পদার্থবিদ্যা ও যন্ত্রবিদ্যার সূত্র আয়ত্ত ও প্রয়োগ করতে শিখেছিল।

পরবর্তীকালে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বহু লক্ষ মানুষের সঞ্চিত এ সকল অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বিজ্ঞানের বিভিন্ন সূত্র আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছিল। উচ্চ পুরোপলীয় যুগে মানুষ হাতিয়ার তৈরির হাতিয়ার অর্থাৎ যন্ত্র নির্মাণ করতে শিখেছিল। এ সময় বাটালি, ছেদনযন্ত্র প্রভৃতির নির্মাণ কৌশল আয়ত্ত করার ফলেই মানুষের পক্ষে হাড় ও শিঙের বিভিন্ন হাতিয়ার তৈরি করা সম্ভব হয়। এই প্রথম মানুষ খাঁজকাটা বল্লম, মাছ ধরার হার্পুন, ছিদ্র বিশিষ্ট হাড়ের সঁই প্রভৃতি নির্মাণ করতে সক্ষম হল।

অবশ্য আদিম মানুষ ঐসব যন্ত্র কেবল হাতিয়ার নির্মাণেই নয়, হাড়ের গায়ে ছবি খোদাই করা বা হাড়ের সুন্দর মূর্তি তৈরি করার কাজেও ব্যবহার করত। হাড়, শিঙ এবং হাতির দাঁতের হাতিয়ার ও শিল্পদ্রব্য তৈরির কাজে ম্যাগদালেনীয় মানুষরা অন্য সব আদিম মানুষদের তুলনায় অনেক বেশি উৎকর্ষ অর্জন করেছিল। এ কাজে তাদের মতো দক্ষতা এবং শিল্পপটুতা কেবল এস্কিমোরাই দেখাতে পেরেছে।

উচ্চ পুরোপলীয় যুগে পৌঁছানোর অনেক আগেই মানুষ কাঠের হাতিয়ার ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। জার্মানিতে অনেক প্রাচীনকালের এক হাতির কঙ্কালের মধ্যে গাঁথা অবস্থায় একটা কাঠের বলুম পাওয়া গেছে। উচ্চ পুরোপলীয় এবং মধ্যোপলীয় যুগের মানুষ পাথরের হাতিয়ারে কাঠের হাতল সংযোগ করতে শিখেছিল। শিকারীরা কাঠের বাঁট বা হাতলে পাথরের ধারালো অগ্রভাগ সংযোজন করে বর্শা, হার্পন প্রভৃতি তৈরি করত।

এমনকি তীর-ধনুক আবিষ্কারের পর কাঠের দণ্ডের সামনের দিকে পাথরের সূচীমুখ বসিয়ে তীর পর্যন্ত তৈরি করা হত। মধ্যোপলীয় যুগে বনভূমি বিস্তার লাভ করার সাথে সাথে কাঠের কাজেরও প্রসার ঘটে। ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের মানুষরা ব্যাপক হারে বনের গাছ কাটত এবং পাথরের কুঠার ও বাটালি দিয়ে বুমেরাং ধরনের নিক্ষেপণ অস্ত্র, ডোঙ্গা বা শালতি নৌকা, নৌকার দাঁড় প্রভৃতি তৈরি করত।

ডোঙ্গা নৌকা তৈরি করা হত বড় গাছের গুড়িতে খোঁড়ল সৃষ্টি করে। প্রথমে একপাশে লম্বালম্বিভাবে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে তারপর কুঠার বাটালি ইত্যাদির সাহায্যে চেঁছে ঐ খোঁড়ল সৃষ্টি করা হত। আমাদের দেশে এখনও গ্রামাঞ্চলে তাল-গাছের গুঁড়ি কেটে তৈরি করা ডোঙ্গা নৌকা দেখা যায়। পুরোপলীয় যুগে মানুষ শক্তিশালী বা দ্রুতগতিসম্পন্ন প্রাণী শিকারের উদ্দেশে ফাঁদের ব্যবহার আয়ত্ত করেছিল।

প্রথম প্রথম মানুষ পশুর পালকে তাড়িয়ে এনে জলাভূমিতে বা পাহাড়ের উপর থেকে নিচে অথবা বড় আকারের গর্তে ফেলে তারপর শিকারীরা গর্ত খুঁড়ে নিচে তীক্ষ্ণ কাঠের শূল পুঁতে রাখত এবং গর্তের মুখ ডালপালা হত্যা করত। এভাবেই সম্ভবত ক্রমে ক্রমে কৃত্রিমভাবে প্রাণী শিকারের জন্য আদিম দিয়ে ঢেকে রাখত। হাতি বা অন্য প্রাণী ঐ পথ দিয়ে গেলে ভুলক্রমে গর্তে পড়ে শূলে বিঁধে মারা যেত।

কঙ্গোর পিগমি শিকারীরা আজও গর্ত খুঁড়ে তার ভিতর বল্লম হাতে লুকিয়ে বসে থাকে। গায়ের গন্ধ ঢাকার জন্য গোবর দিয়ে নিজেদের চাপা দেয়। পাশ দিয়ে হাতি যাওয়ার সময় তারা লাফ দিয়ে উঠে হাতির পেট ফুঁড়ে দেয় বর্শা দিয়ে। আজকালকার আদিবাসীদের শিকার-কৌশল আলোচনা করলে আদিম মানুষের কার্যকলাপ সম্পর্কে ধারণা করা সহজ হবে, কারণ আজকালকার আদিবাসীদের কাজের মধ্যে পুরোপলীয় যুগের অনেক কর্মকৌশলের রেশ প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় রয়ে গেছে।

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী শিকারীরা এমুপাখি শিকার করতে হলে একটা বড় পাতাসুদ্ধ ডাল হাতে করে তার আড়ালে লুকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে হেঁটে পাখির কাছে যায় এবং তাকে হত্যা করে (উটপাখির মত এমুও উড়তে পারে না)। আফ্রিকার বুশম্যানরা উটপাখির পালকের মালা গলায় পরে আর একটা মাথা-বাঁকানো লাঠি সামনে ধরে উটপাখি সেজে পাখিদের কাছে যায় এবং বিষ মাখানো তীর মেরে তাদের হত্যা করে।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

উত্তর আমেরিকার আদিম শিকারীরা বাইসন শিকারের সময় বাইসনের চামড়ায় গা ঢেকে এবং হরিণ শিকারের সময় হরিণের চামড়ায় আত্মগোপন করে পশুর পালের কাছে গিয়ে তাদের শিকার করত। নানা রকমের ফাঁদ ব্যবহার করার জন্য এসব আদিম শিকারীদের বিভিন্ন পশুর স্বভাব ও আচরণ খুব ভালভাবে জানতে হত। পশুকে ফাঁদে ফেলার জন্য অনেক সময় ঝোপ-জঙ্গল বা ঘাসের বনে আগুন ধরানো হত।

আফ্রিকার আদিম শিকারীরা এভাবে হাতি শিকার করত। হাতির পালের সন্ধান পেলে শিকারীরা তাদের ঘিরে একটা বড় বৃত্ত ধরে আগুন লাগাত। আগুনের বেড়াজালে আটকা পড়া হাতিগুলোকে অতঃপর শিকার করা হত। উত্তর আমেরিকার আদিম শিকারীরা অনুরূপ পদ্ধতিতে বাইসন শিকার করত। আদিম শিকারীরা পশু শিকারের সাথে সাথে সুযোগ মতো মাছও শিকার করত।

আর নদী বা সমুদ্রের তীরের মতো সুবিধাজনক স্থানে যারা বাস করত তারা মাছ শিকারের উপর পুরোপুরি নির্ভর করেও চলতে পারত। মাছ ধরার যে পদ্ধতি পুরোপলীয় যুগের শেষ ভাগ অথবা মধ্যোপলীয় যুগ থেকে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল তা হল জাল দিয়ে মাছ ধরা। ছিপ-বড়শি দিয়ে মাছ ধরার কৌশল অনেক আদিম শিকারীদের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও সর্বত্র তা প্রসার লাভ করেনি।

আদিম মানুষরা ছোট হাত-জাল থেকে শুরু করে নদীতে ব্যবহার করার মতো টানা জাল সবই ব্যবহার করত। মধ্যোপলীয় যুগের (প্রায় আট দশ হাজার বছর আগেকার) মাছ ধরা জালের সন্ধান এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। পুরোপলীয় যুগে জাল তৈরি করার মতো দড়ি বা সুতলী আবিষ্কৃত হয়েছিল কি না সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। অবশ্য, পুরোপলীয় যুগের পাথরে আঁকা একটি ছবিতে দেখা যায়৷ একটি মেয়ে দড়ির মই বেয়ে উঠে মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করছে।

কিন্তু এ দড়ি চামড়ার ফালি দিয়েও তৈরি হয়ে থাকতে পারে। যাহোক, উচ্চ পুরোপলীয় যুগের শেষ দিকে (১২-১৪ হাজার বছর আগে) মাছ ধরার জাল আবিষ্কৃত হয়েছিল বলে ধরে নিলে সম্ভবত খুব বেশি ভুল হবে না। পুরান পাথরের যুগের মানুষরা মাছ ধরার চাঁই আবিষ্কার করেছিল। বাঁশ, বেত বা গাছের ডাল দিযে তৈরি ঐ ধরনের চাঁই এখনও পর্যন্ত ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের মানুষরা ব্যবহার করে।

পুরোপলীয় যুগে নৌকার আবিষ্কার হয়েছিল কি না সে বিষয়ে প্রত্যক্ষ কোনো প্রমাণ বা সে আমলের কোনো নৌকার ছবি কোথাও পাওয়া যায়নি। তথাপি মানুষ যখন থেকে ব্যাপকভাবে মাছ শিকারের দিকে দৃষ্টি দেয়, তারপর যে ভেলা এবং নৌকার ব্যবহার শুরু হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষত টানা জাল ব্যবহার করতে যে নৌকার প্রয়োজন হত এ বিষয়ে পণ্ডিতরা একমত।

সবচেয়ে পুরান যে নৌকার সন্ধান পাওয়া গেছে তা সোয়া আট হাজার বছর আগেকার। হল্যাণ্ডে পাওয়া এ নৌকাটি ছিল গাছের গুড়ি থেকে তৈরি ডোঙ্গা নৌকা পাও ছাড়া বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জেও ৫০-৬০ ফুট লম্বা কয়েকটি সুপ্রাচীন কালের শালতি নৌকা পাওয়া গেছে। ডোঙ্গা ছাড়া ভেলা এবং চামড়ার নৌকাও আদিম মানুষ আবিষ্কার করেছিল। কাঠের গুড়ি; নলখাগড়া, বড় লম্বা ঘাস ইত্যাদি একসাথে বেঁধে ভেলা তৈরি করা হত। চামড়া সেলাই করে তার ভিতর বাতাস পুরে সেটাকে নৌকার মতো ব্যবহার করা

 

আদিম সমাজের হাতিয়ার, শিকার কৌশল যানবাহন

প্রায় সাড়ে আট হাজার বছর আগের একটি ডোঙ্গা নৌকা। হল্যাণ্ডে এটি পাওয়া গেছে। গাছের গুড়ির খুদে এ নৌকা তৈরি করা হত।

হত অনেক জায়গাতেই। চামড়ার নৌকার উৎকৃষ্টতম নিদর্শন হচ্ছে এস্কিমোদের ‘উমিয়াক’ এবং ‘কায়াক’। কাঠের কাঠামোর উপর চামড়া টান টান করে আটকিয়ে এ সব নৌকা তৈরি করা হয়। কায়াক শুধু মাছ ধরার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং এতে একজনমাত্র শিকারীর স্থান সঙ্কুলান হয়। সিন্ধুঘোটক প্রভৃতি বড় প্রাণী শিকারের জন্য এস্কিমোরা ‘উমিয়াক’ ব্যবহার করে। এ সকল চামড়ার নৌকা সম্ভবত মধ্যোপলীয় যুগের আবিষ্কার।

পুরোপলীয় যুগের শেষ ভাগে বা মধ্যোপলীয় যুগে শিকারীরা একটা নতুন সহায়ক শক্তি আয়ত্ত করার ফলে তাদের শিকারীগুণ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। এ সহায়ক শক্তি হলো পোষ মানা কুকুর। কুকুর হলো প্রথম প্রাণী যাকে মানুষ পোষ মানিয়ে নিজের কাজে লাগিয়েছে। তীব্র ঘ্রাণ-শক্তির গুণে কুকুর বহু দূর থেকে শিকারের গন্ধ পেয়ে মানুষকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেত এবং পশুর পালকে তাড়া করে বা আক্রমণ করে মানুষকে শিকারে সাহায্য করত।

ইউরোপ আমেরিকায় এখনও কুকুরের পাল নিয়ে দল বেঁধে শিকারে যাওয়ার রেওয়াজ আছে। কুকুর প্রথম কিভাবে পোষ মেনেছিল, সে বিষয়ে নানা মত আছে। কুকুরের উৎপত্তি হয়েছে নেকড়েজাতীয় প্রাণী থেকে। ছোট আকারের নেকড়ে বা কুকুর সম্ভবত অনেক কাল আগে থেকেই শিকারীদের আস্তানার কাছে ঘোরাফেরা করত এবং কালক্রমে এরা মানুষের অনুগত হয়ে পড়ে।

কুকুর শুধু শিকারেই সাহায্য করত না, বরফের উপর দিয়ে যাতায়াতের সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে মানুষ কুকুরে টানা শ্লেজ-গাড়ির আবিষ্কার করে। শ্লেজ হচ্ছে চাকাবিহীন এক রকম গাড়ি, শুধু মসৃণ বরফের উপর দিয়েই এগুলোকে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বলা প্রয়োজন যে, আদিম শিকারীদের যুগে চাকার আবিষ্কার হয়নি। চাকা অনেক কাল পরের জিনিস।

কুকুর ছাড়াও, শিকারী ও মৎস্য শিকারী মানুষরা অন্যান্য পশু ও প্রাণীদের পোষ মানিয়ে কাজে লাগিয়েছে। মাছের ঝাঁককে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক জায়গায় উদবিড়াল (ভোঁদড়) এবং কুকুরকে ব্যবহার করা হয়। চীনের অনেক স্থানে সামুদ্রিক পাখিকে পোষ মানিয়ে শিক্ষা দেওয়া হয় পানিতে ডুব দিয়ে মাছ ধরে আনার জন্য। এসব পাখি যাতে মাছ খেয়ে না ফেলে সে উদ্দেশ্যে তাদের গলায় একটা দড়ির ফাঁস লাগানো থাকে।

আরও দেখুন :

Leave a Comment