যা গারো জনগোষ্ঠী এর অর্ন্তভুক্ত, ভাষাবিজ্ঞানীদের শ্রেণীকরণ অনুসারে গারোদের ভাষা তিব্বতী-বর্মী ( Tibeto- Burman ) ভাষা পরিবারের ‘বোড়ো-গারো’ শাখার অন্তর্গত। কোচ, হাজং, রাজবংশী প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর আদি ভাষা থেকে শুরু করে বোড়ো, ত্রিপুরা প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর ভাষাও এই শাখার অন্তর্গত।
বাংলাদেশের গারোরা এখনো তাদের মাতৃভাষা ধরে রেখেছে, যদিও এর চর্চা মূলতঃ কথ্যরূপেই সীমাবদ্ধ। অবশ্য এদেশে খুব সীমিত আকারে গারো ভাষার লিখিত চর্চাও রয়েছে, তবে এক্ষেত্রে যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অভাবে অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মতই গারোরাও প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার শিকার। অবশ্য সরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নেত্রকোণার বিরিশিরিস্থ ‘উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী’ এক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা রাখছে।
সংস্কৃতি ও আর্থসামাজিক অবস্থা

এছাড়া বহু বছর যাবত রেডিও বাংলাদেশের ঢাকা কেন্দ্র থেকে গারো ভাষায় ‘সাল গিত্তাল’ (নূতন সূর্য) নামক একটি অনুষ্ঠান নিয়মিত প্রচারিত হয়ে আসছে।ঐতিহ্যগতভাবে গারোদের সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল কৃষি-নির্ভর গ্রামীণ জীবনযাত্রাকে ঘিরে। শহুরে প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী অনুষ্ঠানে এই ‘সনাতনী গারো সংস্কৃতি’র অনেক উপাদান এখনো নৃত্য-গীত-বাদ্য প্রভৃতির মাধ্যমে প্রদর্শিত হয়।
তবে এ ধরনের ‘মঞ্চায়িত’ সংস্কৃতি অনেকটাই খন্ডিত, মূল থেকে বিচ্ছিন্ন বা ক্ষেত্রবিশেষে সাম্প্রতিককালে উদ্ভাবিত। নৃবৈজ্ঞানিক অর্থে ‘সংস্কৃতি’ যে অনেক ব্যাপকতর বিষয়, দৈনন্দিন জীবনের অনুশীলনে নিহিত একটি জীবন্ত, চলমান ব্যবস্থা, এ উপলব্ধি আপনার নিশ্চয় হয়েছে। কাজেই কখনো যদি টিভিতে বা মঞ্চে গারোদের ‘ঐতিহ্যবাহী কমলা-তোলা নাচ’ জাতীয় কিছু দেখেন, তাহলে একটু তলিয়ে দেখবেন আদৌ সেটা ‘ঐতিহ্যবাহী’ কিছু কিনা, বা হয়ে থাকলেও কবে কিভাবে কাদের দ্বারা সেই ঐতিহ্যের চর্চা শুরু হয়েছে।

অন্যান্য জনগোষ্ঠীদের মধ্যে যেমন, তেমনি গারোদের মধ্যেও ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে চলছে। অর্থাৎ গারো সংস্কৃতিও স্থির, পরিবর্তনহীন কোন বিষয় নয়। গারোদের মধ্যে সংগটিত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্যে ধর্মের প্রসঙ্গটি এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। ব্রিটিশ আমল থেকে মিশনারীদের প্রচেষ্টার সূত্রে গারোদের মধ্যে খ্রিস্টান ধর্ম যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছে। বাংলাদেশের গারোদের মধ্যে অধিকাংশই বর্তমানে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। অল্পসংখ্যক যারা ধর্মান্তরিত না হয়ে পূর্বের বিভিন্ন বিশ্বাস ও আচার এখনো অনুসরণ করছে, গারোদের মধ্যে তারা ‘সাংসারেক’ নামে পরিচিত।
অবশ্য যারা ধর্মান্তরিত হয়েছে, তারা যে সাংস্কৃতিকভাবে পুরোপুরি রূপান্তরিত হয়েছে, পূর্বের কোন আচার-বিশ্বাস ধরে রাখে নি, একথা বলা যায় না। যেমন, ‘মাতৃসূত্রীয়’ গোত্র ব্যবস্থার অনেক উপাদান সমকালীন খ্রিস্টান গারোরাও এখনো ধরে রেখেছে। অতীতে গারোদের জীবিকার মূল উৎস ছিল জুমচাষ ও বনজ সম্পদ আহরণ, তবে বর্তমানে বাংলাদেশের গারোদের মধ্যে জুমচাষের প্রচলন নেই। জুমচাষের পরিবর্তে স্থায়ী চাষাবাদ, ফলের বাগান প্রভৃতির উপর অনেকে নির্ভর করে। তবে ঔপনিবেশিকতার ইতিহাসের জের ধরে গারো-অধ্যুষিত এলাকাসমূহের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এখন সরকারের বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন।

এছাড়া অন্যান্য বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়ও গারোদের অনেকে ভূমি ও ভিটামাটি হারিয়েছে। ফলে গারোদের অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। অবশ্য তাদের মধ্যে সাক্ষরতার বেশ প্রসার ঘটেছে, এবং সেসূত্রে অনেকে শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকায়, অভিবাসিত হচ্ছে। তবে অভিবাসী গারোদের অনেকেই মূলতঃ স্বল্প আয়ের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত – নার্স, গার্মেন্টস-কর্মী, উচ্চবিত্ত এলাকার গৃহ-কর্মী প্রভৃতি হিসাবে। অবশ্য উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত ছাত্রছাত্রী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত চাকুরিজীবীরাও কিছু রয়েছে এদের পাশাপাশি। এই অভিবাসিত গারোরা সামগ্রিকভাবে কতটা কিভাবে নূতন পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে, তার উপর কিছুটা হলেও নির্ভর করবে গারো সমাজ ও সংস্কৃতির আগামী দিনের স্বরূপ।
