চাকমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি

যা চাকমা জনগোষ্ঠী এর অর্ন্তভুক্ত, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী পাহাড়ী জনগোষ্ঠীদের মধ্যে ভাষাগত দিক থেকে চাকমারা ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এই অর্থে যে, অন্য সকল গোষ্ঠীর ভাষাসমুহ “তিব্বতী-বর্মী’ (Tibeto- Burman ) | পরিবারভুক্ত হলেও চাকমা ভাষা বাংলার মতই ‘ভারতীয়-ইউরোপীয়’ (Indo-European) ভাষা পরিবারের অন্তর্গত (একথা অবশ্য তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যার সাথে চাকমা ভাষার বড় কোন | পার্থক্য নেই)। চাকমা ভাষার সাথে চট্টগ্রামী বাংলার যথেষ্ট মিল রয়েছে। তবে চাকমা ভাষাকে বাংলার | একটি উপভাষা হিসাবে বিবেচনা না করে একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসাবেই গণ্য করা হয়।

চাকমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি

ধারণা করা হয়, একসময় চাকমাদের পূর্বসূরীদের ভাষাও তিব্বতী-বর্মী পরিবারভুক্ত ছিল, তবে কয়েক শতাব্দী আগে যে প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রামী বাংলার বিকাশ ঘটেছিল, সেই একই প্রক্রিয়ায় সমান্তরালভাবে চাকমা ভাষারও | আবির্ভাব ঘটে থাকতে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় ও চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে চাকমা ভাষার একটা | লিখিত রূপ প্রচলিত ছিল, যে কাজে ব্যবহৃত হরফ বর্মী বর্ণমালার অনুরূপ। বর্তমানে এই চাকমা বর্ণমালার কার্যকর কোন ব্যবহার নেই, যদিও চাকমা সমাজে অনেকে এটিকে নূতন করে চালু করার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছেন।

চাকমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি

 

চাকমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি

 

এমনিতে চাকমা ভাষায় যাঁরা সাহিত্য চর্চা করেন, তাঁরা মূলতঃ বাংলা হরফই ব্যবহার করেন। এখন পর্যন্ত চাকমা বা অন্য কোন পাহাড়ী ভাষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্কুলে শেখানোর ব্যবস্থা গৃহীত হয় নি, তবে অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের তত্ত্বাবধানে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

চাকমা লোক-সংস্কৃতির অনেক উপাদানে জুমচাষ-নির্ভর জীবনযাত্রার প্রতিফলন দেখা যায়। বর্তমানে অবশ্য চাকমাদের খুব কম অংশই (এক চতুর্থাংশের নীচে) জুমচাষের উপর নির্ভর করে। তথাপি শহুরে শিক্ষিত চাকমাদের শিল্প-সাহিত্য চর্চায় ফেলে আসা জুমিয়া জীবনের নান্দনিক উপস্থাপনার প্রয়াস লক্ষ্য | করা যায়। এই প্রেক্ষিতে চাকমা লোক-সংস্কৃতির অনেক উপাদান নূতন প্রেক্ষাপটে নূতন আঙ্গিকে শহুরে | মধ্যবিত্ত জীবনে অঙ্গীভূত হচ্ছে, যেমনটা অন্যান্য সমাজের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, এক সময় চাকমা নারীদের সাধারণ পোশাক ছিল ঘরে বোনা ‘পিনন’ (সেলাই বিহীন মোটা কাপড়ের ‘পেটিকোট) ও ‘খাদি’ (বক্ষবন্ধনী), যে ধরনের পোষাক তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা প্রভৃতি অন্যান্য পাহাড়ী সম্প্রদায়ও ব্যবহার করে।

শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাকমা নারীরা অনেকে প্রাত্যহিক ভিত্তিতে এই পোশাক আর ব্যবহার করে না, তথাপি দেখা যায় নিজেদের চাকমা তথা পাহাড়ী পরিচয়কে তুলে ধরার লক্ষ্যে তারা বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে পিনন-খাদি পরিধান করে, যদিও ‘খাদি’র বর্তমান ব্যবহার অনেকটা ওড়নার সাথে তুলনীয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পোশাক আর ঘরে নিজের হাতে বানানোও না, বরং বাণিজ্যিকভাবে বজ্রকলে উৎপাদিত পণ্য হিসাবে এগুলি বাজার থেকে কেনা। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, পিনন- খাদির উৎপাদন ও ব্যবহারের প্রেক্ষাপট পাল্টে গিয়ে এই পোশাক শহুরে প্রেক্ষাপটে নূতন তাৎপর্য নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

চাকমা বর্ষপঞ্জীর সবচাইতে বড় উৎসবের নাম বিজু, যা চৈত্র্যের শেষ দুদিন ও বৈশাখের প্রথম দিন মিলে টানা তিন দিন ধরে চলে (মারমা ও ত্রিপুরারাও ভিন্ন নামে একই উৎসব পালন করে)। পুরানো বছরকে বিদায় দিয়ে নূতন বছরকে বরণ করা বিজু উৎসবের উপলক্ষ, তবে এর সামাজিক তাৎপর্য বাঙালী মুসলমানদের ঈদ বা বাঙালী হিন্দুদের শারদীয় দুর্গোৎসবের সাথে তুলনীয়।

অতীতে কৃষি-নির্ভর গ্রামীন জীবনের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে বিজু উৎসব পালিত হত। তবে শহুরে প্রেক্ষাপটে বিজু এখন আর শুধুমাত্র পানাহার, বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো, বা বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজনের সাথে সাক্ষাতের আনন্দ ইত্যাদির মধ্যে সীমিত নেই। সামাজিক মিলন বা পুনর্মিলনের একটি সময় ছাড়াও বিজু এখন চাকমা তথা পাহাড়ী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সচেতন অনুশীলন তথা পুনঃনির্মাণের একটা উপলক্ষও বটে।

ধর্মীয়ভাবে চাকমারা মূলতঃ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, তবে বহু প্রজন্ম ধরে বাহিত লোকায়ত বিশ্বাস ও আচার অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক স্রোতধারাসমূহের বিভিন্ন প্রভাবও তাদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। লোকায়ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি একসময় কালীপূজাসহ বিভিন্ন “হিন্দু” আচার অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় বিশ্বাসের যথেষ্ট প্রভাব চাকমা সমাজে পড়েছিল, পরবর্তীতে বৌদ্ধ ধর্ম চাকমা সমাজে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াতে তা অনেকটা স্তিমিত হলেও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি। পক্ষান্তরে চাকমা রাজারা একসময় মুসলিম ধাঁচের নাম ব্যবহার করলেও ধর্মীয়ভাবে চাকমা সমাজে ইসলামের প্রত্যক্ষ বা ব্যাপক কোন প্রভাব লক্ষ্য করা যায় না।

 

চাকমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি

 

অবশ্য চট্টগ্রামের বাঙালী মুসলমান জনসমষ্টির ঐতিহাসিক আবির্ভাবে অতীতে চাকমা তথা অন্যান্য পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর কিছু অংশ শামিল হয়ে থাকতে পারে, যদিও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। বলা বাহুল্য, অন্য যে কোন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির মতই চাকমা সংস্কৃতিও একটি বহমান ব্যবস্থা, যেখানে সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে চলছে যেগুলোর কোনটা ভেতর থেকে উৎসারিত, কোনটা বাইরে থেকে আসা।

Leave a Comment