বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের তালিকা, সংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থান

আজকের আলোচনার বিষয় বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের তালিকা, সংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থান – যা আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের পরিচিতি এর অর্ন্তভুক্ত,  বাংলাদেশে মোট কয়টি আদিবাসী জাতিসত্তা রয়েছে, তার কোন সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায় না। সরকারীভাবে অবশ্য ‘আদিবাসী’র পরিবর্তে ‘উপজাতীয়’ পরিচয়ের আওতায় কিছু পরিসংখ্যান রয়েছে। যেমন, ১৯৯১ সালের আদমশুমারী প্রতিবেদনে ২৭টি ‘উপজাতীয়’ সম্প্রদায়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের মোট জনসংখ্যা হিসাব করা হয়েছিল ১২,০৫,৯৭৮। তবে উক্ত প্রতিবেদনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের যে তালিকা দেওয়া রয়েছে, তা অসম্পূর্ণ এবং কিছু ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ।

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের তালিকা, সংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থান

 

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের তালিকা, সংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থান

 

এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারী জরিপের ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে ‘উপজাতীয়’দের মোট জনসংখ্যা সরকারী হিসাবের চাইতে বেশী হবে। আর সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন হিসাব মিলিয়ে দেখলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশে মোট ৪৫টির মত আদিবাসী সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব থাকতে পারে। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কোন জরিপ ছাড়া নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। বলা বাহুল্য, এ ধরনের কোন জরিপ চালানোর ক্ষেত্রে কোন জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতীয়’ বা ‘আদিবাসী’ হিসাবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কি মাপকাঠি ব্যবহার করা হবে, তার উপর অনেকাংশে নির্ভর করবে জরিপের ফলাফল।

এমন অনেক জনগোষ্ঠী আছে–যেমন, বর্মন, বেদে প্রভৃতি–যারা ক্ষেত্রবিশেষে বৃহত্তর বাঙালী সমাজের অংশ হিসাবে পরিচিত বা পরিচিত হতে আগ্রহী, আবার ক্ষেত্রবিশেষে তাদের আলাদা সম্প্রদায় হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে বা করা হয়ে থাকে। আবার এমনও দেখা গেছে যে, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত দুটি জনগোষ্ঠীকে একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের দুটি আলাদা ভাগ হিসাবে কেউ কেউ দেখছেন, আবার কেউ কেউ তাদেরকে আলাদা সম্প্রদায় হিসাবে চিহ্নিত করছেন।

যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক সময় তঞ্চঙ্গ্যাদের চাকমাদের একটি শাখা হিসাবে গণ্য করা হয়েছে, তবে বর্তমানে তারা একটি আলাদা ‘উপজাতি’ হিসাবে সরকারীভাবে স্বীকৃত। স্পষ্টতই, বাংলাদেশে আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংখ্যা কয়টি, তা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে এ ধরনের বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, তবে সাধারণভাবে অপেক্ষাকৃত প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেই তাদের ঘনত্ব বেশী। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য পাহাড়ি এলাকা, গড়াঞ্চল, উপকুলীয় এলাকা ও উত্তরবঙ্গে আদিবাসীদের বসবাস রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বর্তমানে মোট ১১টি ‘উপজাতীয়’ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকৃত, যেগুলি হল (নামের আদ্যাক্ষরের ক্রমানুসারে), খিয়াং, খুমি, চাক, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, পাঙ্খো, বম, মারমা, ম্রো ও লুসাই। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর অংশবিশেষ অবশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, রাজবাড়ি প্রভৃতি জেলায়ও রয়েছে। এরকম আরো কিছু জনগোষ্ঠী রয়েছে যাদের ভৌগোলিক বিস্তৃতি একাধিক বিভাগ জুড়ে রয়েছে।

যেমন, রাখাইনদের বসবাস রয়েছে কক্সবাজার, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলাসমূহে। গারো ও হাজংরা ঢাকা ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে আছে। গারো ও হাজংরা ছাড়াও ঢাকা বিভাগের ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও অন্যান্য জেলায় কোচ, ডালু, বর্মন (ক্ষত্রিয়), বানাই, রাজবংশী, হদি প্রভৃতি জনগোষ্ঠী, এবং সিলেট বিভাগে খাসিয়া, পাত্র, মণিপুরী প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। উত্তরবঙ্গে (রাজশাহী বিভাগ) উরাও, কোল, পাহাড়িয়া, মালো, মাহাতো, মাহালী, মুন্ডা, রাজবংশী, সাঁওতাল প্রভৃতি জনগোষ্ঠী রয়েছে।

জনসংখ্যার বিচারে চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামের তো বটেই, সমগ্র বাংলাদেশেরও বৃহত্তম আদিবাসী জনগোষ্ঠী, ১৯৯১ সালের আদমশুমারীতে যাদের সংখ্যা ছিল আড়াই লক্ষের উপরে। উক্ত আদমশুমারী অনুযায়ী জনসংখ্যার দিক থেকে চাকমাদের পরেই রয়েছে যথাক্রমে সাঁওতাল (দুই লক্ষাধিক), মারমা (এক লক্ষ সাতান্ন হাজার), ত্রিপুরা (একাশি হাজারের উপরে), গারো (চৌষট্টি হাজারের উপরে), মণিপুরী (প্রায় পঁচিশ হাজার), ম্রো (বাইশ হাজারের উপরে, যারা ‘মুরং” নামেও পরিচিত), তঞ্চঙ্গ্যা (প্রায় বাইশ হাজার), রাখাইন (সতের হাজার), কোচ (সাড়ে ষোল হাজার), বম (সাড়ে তের হাজার), খাসিয়া (বার হাজারের উপরে), হাজং (সড়ে এগার হাজার), উরাও (আট হাজারের উপরে) রাজবংশী (সাড়ে সাত হাজার), মাহাতো (সাড়ে তিন হাজার), পাঙ্খো (তিন হাজারের বেশী)।

 

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের তালিকা, সংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থান

 

আদমশুমারীতে খিয়াং, চাক, মুন্ডা, খুমি, লুসাই প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর তালিকাও রয়েছে যাদের জনসংখ্যা দুই-আড়াই হাজারের মত বা আরো কম। এছাড়া ‘বুনো” ও “উরুয়া’ নামে দুইটি জনগোষ্ঠীর উল্লেখও রয়েছে যাদের সম্পর্কে অন্যত্র তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ না করে ‘অন্যান্য’ হিসাবে আড়াই লাখের বেশী উপজাতীয়ের সংখ্যা দেখানো হয়েছে। এদের মধ্যে থাকতে পারে কোল, খন্ড, খারিয়া, ডালু, তুরী, পাহান, বানাই, সিং, পাত্র, বর্মন, বাগদি, বেদিয়া, মালো, মাহালি, মুরিয়ার, মুসহর, রাই, রাজুয়াড়, হদি, হো প্রভৃতি জনগোষ্ঠী, বিভিন্ন বইপুস্তকে যাদের উল্লেখ রয়েছে, যদিও তাদের সকলের পরিচয় বা সংখ্যা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দুর্লভ।

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment