আদিবাসী পরিচয়ের তাৎপর্য

আজকের আলোচনা আদিবাসী পরিচয়ের তাৎপর্য নিয়ে। বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৯৯ ভাগ মানুষ বাঙালী হিসাবে পরিচিতি, তবে বাঙালীদের পাশাপাশি এদেশে বেশ কিছু ক্ষুদ্র জাতিসত্তারও (ethnic minority) বসবাস রয়েছে যেমন চাকমা, গারো, – সাঁওতাল প্রভৃতি – যারা সচরাচর উপজাতীয় বা আদিবাসী হিসাবে পরিচিত। এইসব জনগোষ্ঠীর পরিচয় সম্পর্কে সাধারণ কোন আলোচনায় যেতে হলে সর্বাগ্রে যে প্রশ্নটা চলে আসে তা হল, তাদেরকে উপজাতীয়, আদিবাসী বা অন্য কোন নামে অভিহিত করার তাৎপর্য কি? বাংলাদেশে ‘উপজাতীয়” বা ‘আদিবাসী’ হিসাবে পরিচিত জনগোষ্ঠীরা বাঙালীদের তুলনায় সংখ্যায় খুবই অল্প, তবে সংখ্যাল্পতার কারণে যে তাদের ক্ষেত্রে এই পরিচয়গুলি ব্যবহার করা হয়, তা বলা যায় না।

বাংলায় ‘উপজাতি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় ইংরেজী ‘tribe’-এর প্রতিশব্দ হিসাবে। নৃবিজ্ঞানে ‘tribe’ ধারণা ব্যবহৃত হয় রাষ্ট্রের আবির্ভাব ও প্রসারের পূর্বে জ্ঞাতিসম্পর্কের ভিত্তিতে সংগঠিত বিশেষ ধরনের সমাজকে বোঝাতে। লক্ষ্যণীয় যে, বর্তমান বিশ্বে সকল জনগোষ্ঠীই কোন না কোন রাষ্ট্রের আওতায় বাস করে, কাজেই এই প্রেক্ষিতে উল্লিখিত বিশেষ অর্থে কোন জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতীয়’ হিসাবে চিহ্নিত করা সমস্যাজনক। কয়েক শতাব্দী আগে ইউরোপীয়রা তাদের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যসমূহ বিস্তারের সময় পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ছিল যারা নিজেরা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগঠিত ছিল না বা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগঠিত বৃহত্তর কোন সমাজের অংশ ছিল না।

আদিবাসী পরিচয়ের তাৎপর্য

 

আদিবাসী পরিচয়ের তাৎপর্য
আদিবাসী পরিচয়ের তাৎপর্য

 

এ ধরনের জনগোষ্ঠীই ঔপনিবেশিক সময়কাল থেকে ‘উপজাতীয়’ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে। তবে ‘উপজাতীয়’ হিসাবে চিহ্নিত সকল জনগোষ্ঠীই প্রকৃতপক্ষে প্রাক- রাষ্ট্রীয় স্তরের সমাজ ছিল কি না, এ নিয়ে খোদ নৃবিজ্ঞানেই বিতর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক বা উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের আওতায় চলে আসার পরে এসব জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিতভাবে আর সে অর্থে ‘উপজাতীয়’ সমাজ বলা যায় না।

এ ধরনের তাত্ত্বিক সমস্যার পাশাপাশি প্রচলিত ব্যবহারে ‘উপজাতীয়’ শব্দের নেতিবাচক ব্যঞ্জনাও তৈরী হয়েছে। ‘উপজাতীয়’ হিসাবে চিহ্নিত জনগোষ্ঠীদের সচরাচর ‘আদিম’ ‘বর্বর’ ইত্যাদি আখ্যায়ও ভূষিত করা হয়েছে। এসব কারণে ‘উপজাতীয়’ পরিচয়টা অনেকের কাছে এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়, বিশেষ করে এই নামে পরিচিত মানুষদের কাছে।

বাংলায় অবশ্য আদিবাসী শব্দটিরও একই ধরনের নেতিবাচক ব্যঞ্জনা রয়েছে। তথাপি সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে ইংরেজী indigenous people-এর প্রতিশব্দ হিসাবে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর একটা কারণ হল, ‘উপজাতীয়’ হিসাবে চিহ্নিত জনগোষ্ঠীদের পক্ষ থেকেই এই দাবী উঠেছে যে তাদেরকে ‘আদিবাসী’ (indigenous people) হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

এই দাবীর তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে আন্তর্জাতিক পরিসরে indigenous people বলতে কি বোঝানো হচ্ছে। আভিধানিকভাবে ‘indigenous’ কথাটির অর্থ হচ্ছে স্থানীয়ভাবে উদ্ভূত। কোন বিশেষ অঞ্চলে বসবাসরত একাধিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ কোন জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসাবে শনাক্ত করার অর্থ দাঁড়ায় এই, তারা জাতিগত ও সাংস্কৃতিকভাবে সেখানকার প্রাচীনতম অধিবাসীদের উত্তরসূরী। বলা বাহুল্য, এটি একটি আপেক্ষিক ব্যাপার। অর্থাৎ স্থান ও কালের সীমানা কিভাবে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করছে কোন্ প্রেক্ষিতে কাদের আমরা ‘আদিবাসী’ বলতে পারি।

সাম্প্রতিককালে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে ‘indigenous people’-এর ধারণা ব্যবহার করা হচ্ছে মূলতঃ বিগত পাঁচশ বছরের ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিয়েই। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের মত জায়গায় সেখানকার মূল অধিবাসীদের নিধন, উচ্ছেদ বা সাংস্কৃতিকভাবে ধ্বংস করে কিভাবে ইউরোপীয়রা এই ভূখন্ডগুলোর কর্তৃত্ব নিয়ে নিয়েছিল, সে ইতিহাস আপনার কমবেশী জানা আছে নিশ্চয়।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

এসব জায়গার আদি অধিবাসীদের উত্তরসূরী যেসব জনগোষ্ঠী স্বতন্ত্র সত্তা বজায় রেখে টিকে আছে, তাদেরকে সাধারণভাবে বোঝানোর জন্যই সাম্প্রতিককালে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে ‘indigenous people’ ধারণার ব্যবহার শুরু হয়। এ ধরনের জনগোষ্ঠীদের ঐতিহাসিক বঞ্চনার প্রেক্ষিতে তাদের অনেক দাবীকে আইনগত অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় নেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষিতেই বাংলাদেশে ‘উপজাতীয়’ হিসাবে অভিহিত জনগোষ্ঠীরা ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের স্বীকৃতি চাচ্ছে।

বাংলাদেশসহ আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশের সরকার অবশ্য নিজেদের দেশে বিশেষ কোন জনগোষ্ঠীকে indigenous people হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে আসছে। এর একটা কারণ হল, বর্তমানে সাধারণভাবে এসব দেশের ক্ষমতাসীন শ্রেণীর মানুষরাও নিজ নিজ দেশে দীর্ঘকাল যাবত বসবাসরত জনগোষ্ঠী থেকেই উদ্ভূত। একই দেশে দীর্ঘকাল যাবত বাস করে আসা জনগোষ্ঠীদের মধ্যে কারা সেদেশের আদি বাসিন্দাদের উত্তরসূরী আর কারা নয়, আক্ষরিক অর্থে তা নির্ধারণ করা অনেকক্ষেত্রেই অসম্ভব বা দুঃসাধ্য।

তবে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অনেক দেশেই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ‘জাতীয়তা’র বিশেষ কোন ধারণার ভিত্তিতে, যা অনেকক্ষেত্রে একই দেশের সকল জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে সমানভাবে ধারণ করতে পারেনি। অধিকন্তু, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়া এসব নবীন রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণী ও সংখ্যাগুরু জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা নিজেরাই নিজ নিজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ অব্যাহত রেখেছে।

কাজেই এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মত জায়গায়ও ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে ‘উপজাতীয়’ বা অনুরূপ কোন বিশেষ পরিচয়ে পরিচিত হয়ে আসা বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে indigenous people হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের বিশেষ অধিকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার বলে অনেকে মনে করেন।

উল্লেখ্য যে, আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত Indigenous People-এর ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হওয়ার আগে থেকেই বাংলা ভাষায় ‘আদিবাসী” শব্দটির চল ছিল। যেমন, পাকিস্তান আমলে লেখা আবদুস সাত্তারের ‘আরণ্য জনপদে’ নামক গ্রন্থে চাকমা, সাঁওতাল, গারো প্রভৃতি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে, যদিও ‘আদিবাসীরা কেউ এদেশের ভূমিজ সন্তান নয়’–এ ধরনের বিভ্রান্তিকর বক্তব্যও একই গ্রন্থে পাওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে ‘আদিম’ অর্থেই যে ‘আদিবাসী’ কথাটি ব্যবহৃত হয়, তা বলা বাহুল্য।

তবে বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ বা ‘উপজাতীয়’ হিসাবে পরিচিত জনগোষ্ঠীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের মত দেশের এমন কিছু বিশেষ অঞ্চলে দীর্ঘকাল যাবত বাস করে আসছে যেসব জায়গায় বাঙালী জনবসতি গড়ে উঠেছে অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিককালে। এসব ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী’রা বৃহত্তর বাঙালী জনগোষ্ঠীর চাপের মুখে অনেক ক্ষেত্রেই বহুমাত্রিক অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত হয়েছে, যে সংকট থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি।

এই প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিকভাবে indigenous people হিসাবে চিহ্নিত জনগোষ্ঠীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া চলছে, তাতে শামিল হওয়ার লক্ষ্যেই বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দটির পুরানো নেতিবাচক ব্যঞ্জনা সত্ত্বেও indigenous people এর সমার্থক হিসাবে এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু করা হয়েছে। (বাংলাসহ উপমহাদেশের একাধিক ভাষায় ‘আদিবাসী’ শব্দটির প্রচলন শুরু হয়েছিল সম্ভবতঃ ইংরেজী aboriginal-এর প্রতিশব্দ হিসাবে, যা ব্যুৎপত্তিগতভাবে indigenous-এর সমার্থক, তবে অপেক্ষাকৃত আগে থেকে প্রচলিত এই শব্দটি বর্তমানে প্রধানতঃ অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়।)

 

আদিবাসী পরিচয়ের তাৎপর্য
আদিবাসী পরিচয়ের তাৎপর্য

 

উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের কোন সর্বজনস্বীকৃত বা সরকারী সংজ্ঞা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে নেই। সে যাই হোক, সাম্প্রতিককালে গড়ে ওঠা রেওয়াজ অনুসারে বাংলাদেশে ‘উপজাতীয়’, ‘সংখ্যালঘু জাতিসত্তা’ প্রভৃতি পরিচয়ে পরিচিত জনগোষ্ঠীদের সাধারণভাবে বোঝানোর জন্য এই ইউনিটে আমরা ‘আদিবাসী’ কথাটা ব্যবহার করছি।

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment