সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে গবেষণা পদ্ধতি

সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পঠটি “নৃবিজ্ঞান পরিচিতি” বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।  প্রতিটা জ্ঞানকান্ডেই নির্দিষ্ট কিছু গবেষণা পদ্ধতি রয়েছে। ভৌত ও জৈবিক বিজ্ঞানসমূহে ল্যাবরেটরি বা গবেষণাগারে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। তবে সামাজিক বিজ্ঞানসমূহের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে পরীক্ষামূলক পদ্ধতি (experimental method) প্রয়োগের কোন সুযোগ নেই।

সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে গবেষণা পদ্ধতি

 

সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে গবেষণা পদ্ধতি | নৃবিজ্ঞান পরিচিতি

 

দুটো রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে কি ধরনের বিক্রিয়া ঘটে, বা কোন আণুবীক্ষণিক প্রাণী সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন কতটা তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে, এ জাতীয় বিষয় গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব, কিন্তু একজন সামাজিক বিজ্ঞানীর পক্ষে মানব সমাজের উপর অনুরূপ কোন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো ব্যবহারিক দিক থেকে যেমন সমস্যাজনক, তেমনি নৈতিকভাবেও প্রশ্নসাপেক্ষ। কাজেই সামাজিক বিজ্ঞানসমূহে গবেষণা বলতে সাধারণত কোন পরীক্ষা নিরীক্ষা বোঝায় না।

বিশেষ কোন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য, বা কোন তত্ত্বের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য সামাজিক বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ, জরীপ প্রভৃতি বিভিন্ন পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। অধ্যয়নের বিষয় ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনুসারে প্রতিটা জ্ঞানকান্ডে বিশেষ কিছু পদ্ধতির বিকাশ ঘটেছে। এক্ষেত্রে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানেরও রয়েছে নিজস্ব কিছু গবেষণা পদ্ধতি, যেগুলোর মধ্যে এথনোগ্রাফিক মাঠকর্ম ও তুলনামূলক পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য।

 

মাঠকর্ম:

সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে ‘মাঠ’ বলতে বোঝায় এমন কোন স্থান বা এলাকা যেখানে গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেখানে বসবাসরত মানুষদের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করার এবং তাদের সাথে মেশার, কথা বলার সুযোগ রয়েছে। এভাবে পর্যবেক্ষণ ও কথোপকথন, সাক্ষাতকার প্রভৃতি কৌশল ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিকে মাঠকর্ম বা মাঠ গবেষণা বলা হয়।

ঐতিহ্যগতভাবে অধিকাংশ সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীই মাঠকর্ম সম্পাদন করেছেন প্রযুক্তি বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের বিচারে অপেক্ষাকৃত সরল ধরনের সমাজসমূহের মধ্যে। এই ঐতিহ্য অনুযায়ী নৃবিজ্ঞানীরা যখন মাঠ গবেষণার মাধ্যমে ক্ষুদ্র কোন সম্প্রদায়ের সার্বিক জীবনযাত্রা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করেন, তখন সেটাকে বলা হয় ‘এথনোগ্রাফিক মাঠকর্ম’।

পোলিশ বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী ম্যালিনোস্কি ট্রাব্রিরিয়ান্ড দ্বীপপুঞ্জে সম্পাদিত তাঁর মাঠকর্মের ভিত্তিতে রচিত এথনোগ্রাফিক গ্রন্থ Argonauts of the Western Pacific – এর শুরুতে নৃবৈজ্ঞানিক মাঠকর্মের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি, কিভাবে সেগুলো অর্জন করা যায়, এসব বিষয়ে যে আলোচনা করেছিলেন, তা নৃবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত।

উক্ত আলোচনায় ম্যালিনোস্কি এথনোগ্রাফিক মাঠকর্মের একটি মানদন্ড নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন: কোন জনগোষ্ঠীর সমাজব্যবস্থা বা সংস্কৃতিকে জানার জন্য তাদের মাঝে কমপক্ষে একবছর থেকে, তাদের ভাষা শিখে, তাদের সাথে মিশে, ‘স্থানীয়দের চোখ দিয়ে’ ঐ সমাজ ও সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

এথনোগ্রাফিক মাঠকর্মে গবেষণা এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে সেখানকার মানুষদের সাথে মিশে তথ্য সংগ্রহের কৌশলকে অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণ বলা হয় (participant observation : অন্যভাবেও এর বাংলা করা হয়েছে)। নৃবিজ্ঞানীরা গবেষণা এলাকায় অবস্থান নেওয়ার পর থেকে দৈনন্দিন বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ সযত্নে টুকে রাখতে শুরু করেন, যেগুলো (field notes) চূড়ান্ত কোন প্রতিবেদন লেখার ক্ষেত্রে প্রধান ভিত্তি হিসাবে কাজ করে।

একজন বহিরাগতকে স্থানীয় মানুষরা সহজে আপন করে নেবে, এমন কোন কারণ নেই। কিভাবে স্থানীয় মানুষদের আস্থা অর্জন করা যাবে, তার কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। গবেষণা এলাকায় পৌঁছে প্রত্যেক নৃবিজ্ঞানী তাঁর সাধ্যমত চেষ্টা করেন তাঁর উপস্থিতিকে যতটা সম্ভব স্থানীয় মানুষদের কাছে বোধগম্য ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে, তাদের সাথে সুসম্পর্ক (rapport) তৈরী করতে।

শুরুতে নৃবিজ্ঞানীদের সচরাচর বেগ পেতে হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা সাংস্কৃতিক পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে, অনেকেই মুখোমুখি হন এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক ধাক্কা’র (culture shock)। প্রাথমিক এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠে নৃবিজ্ঞানী চেষ্টা করেন স্থানীয় জীবনযাত্রার সাথে মানিয়ে নিতে।

 

সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে গবেষণা পদ্ধতি | নৃবিজ্ঞান পরিচিতি

 

একটা পর্যায়ে স্থানীয় মানুষরাও হয়ত তাঁকে অনেকটা আপন করে নেয়, বা অন্ততঃ তাঁর উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এভাবে ধীরে ধীরে নৃবিজ্ঞানী গবেষণা এলাকার মানুষদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করেন। এথনোগ্রাফিক মাঠকর্মে নৃবিজ্ঞানীরা সচরাচর কমপক্ষে একবছর গবেষণা এলাকায় থাকার চেষ্টা করতেন, যাতে ঋতুচক্রের একটা পূর্ণ আবর্তনের প্রেক্ষিতে স্থানীয় মানুষদের জীবনযাত্রার ছন্দের পরিবর্তনগুলো তাঁরা পর্যাপ্তভাবে দেখার সুযোগ পান।

অংশগ্রহণকারী পর্যবেক্ষণে নৃবিজ্ঞানীরা স্থানীয় মানুষদের সাথে কথোপকথন ও আলাপচারিতার মাধ্যমে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেন। বাঁধাধরা কোন প্রশ্নের তালিকা মাথায় না রেখে চারপাশে যখন যা ঘটছে, সে অনুযায়ী নিয়মিত অনেক বিষয়ে তাঁরা জানতে চান। তবে প্রয়োজনানুসারে নির্দিষ্ট প্রশ্নমালার ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যক্তির সাক্ষাতকারও গ্রহণ করা হয়।

মাঠকর্ম করতে গিয়ে অনেক নৃবিজ্ঞানীই স্থানীয় মানুষদের মধ্যে এমন দু’একজন ব্যক্তির সন্ধান করেন যাঁরা গবেষণা-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য ও ব্যাখ্যা দিয়ে বিশেষভাবে সহায়তা করতে পারেন। যেমন, কোন প্রবীণ ব্যক্তি হয়ত ভাল বলতে পারেন কার সাথে কে কি ধরনের জ্ঞাতিসম্পর্কের সূত্রে আবদ্ধ। অথবা, ধর্মীয় আচার-বিশ্বাস সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল ব্যাখ্যা দিতে পারেন এমন কোন স্থানীয় বিশেষজ্ঞ হয়ত রয়েছেন।

মাঠকর্ম চলাকালে এ ধরনের ব্যক্তিরা নৃবিজ্ঞানীদের জন্য হয়ে উঠতে পারেন প্রধান তথ্যদাতা (key informant)। এছাড়া স্থানীয় মানুষদের কারো কারো বিস্তারিত জীবন ইতিহাসও (life history) নৃবিজ্ঞানীরা সংগ্রহ করতে পারেন।

সংগৃহীত জীবন ইতিহাস হতে পারে এমন কোন ব্যক্তির, যাঁকে হয়ত সমাজের একজন গড়পড়তা (typical) সদস্য হিসাবে দেখা যায়, অথবা তিনি হতে পারেন স্থানীয় প্রেক্ষাপটে ব্যতিক্রমধর্মী কোন ব্যক্তি। উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ্য থাকে নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে, তার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির উপর আলোকপাত করা। এভাবে তথ্য সংগ্রহের বিভিন্ন কৌশলের সমন্বয়ে এথনোগ্রাফিক মাঠকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে নৃবিজ্ঞানীরা ক্ষুদ্রায়তনের কোন সমাজ বা বৃহদায়তনের কোন সমাজের ক্ষুদ্র কোন অংশ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ তৈরী করেন।

 

তুলনামূলক পদ্ধতি:

আন্তঃসাংস্কৃতিক তুলনা (cross-cultural comparison) সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের একটি অন্যতম গবেষণা পদ্ধতি। মানব জীবনের বিশেষ কোন দিক ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে কি রূপে বিরাজমান ও ক্রিয়াশীল থাকে, তা নৃবিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেন পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাপ্ত এথনোগ্রাফিক তথ্যের আলোকে।

যেমন, নারী-পুরুষের সম্পর্ক সকল সমাজেই অসম কিনা, বা এই অসমতার মাত্রায় কতটা তারতম্য দেখা যায়, কি কি বিষয়ের আলোকে সেই তারতম্য ব্যাখ্যা করা সম্ভব, এ ধরনের কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে লিঙ্গীয় সম্পর্কের বিবিধ সাংস্কৃতিক রূপের তুলনামূলক বিশ্লেষণ আবশ্যক হয়ে ওঠে। পরিবার ও জ্ঞাতিসম্পর্ক থেকে শুরু করে অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম বিভিন্ন বিষয়ে এ ধরনের তুলনামূলক পাঠ সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

 

সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে গবেষণা পদ্ধতি | নৃবিজ্ঞান পরিচিতি

 

জরীপ:

বৃহদায়তনের কোন সমাজে গবেষণা করতে গেলে সামাজিক বিজ্ঞানীরা প্রায়ই জরীপের সাহায্য নিয়ে থাকেন। বিশাল কোন জনগোষ্ঠীর উপর গবেষণা করতে গেলে সমাজের সকল সদস্যের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব নয়, ফলে চেষ্টা করা হয় পরিসংখ্যানবিদ্যার বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে পর্যাপ্ত সংখ্যক কিছু তথ্যদাতা নির্বাচন করতে, যাদেরকে সমাজের বিশেষ কোন গোষ্ঠী, শ্রেণী বা অন্য কোন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত কোন বর্গের জন্য প্রতিনিধিত্বশীল বলে গণ্য করা যেতে পারে।

ধারণাটা অনেকটা এরকম, কোন পুকুরের পানিতে দূষণের মাত্রা পরীক্ষা করার জন্য পুকুরের সমস্ত পানি সংগ্ৰহ করার দরকার নেই, সেখান থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ নমুনা (sample) সংগ্রহ করে তা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে দেখাই বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসরণীয় পদ্ধতি। একইভাবে সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর অংশবিশেষ থেকে জরীপের সাহায্যে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলোর ভিত্তিতে সমগ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে, এরকম বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেন।

সামাজিক- সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীরা ঐতিহ্যগতভাবে ক্ষুদ্র পরিসরে নিবিড় এথনোগ্রাফিক মাঠকর্ম সম্পাদনের উপর জোর দিয়ে আসাতে পরিসংখ্যানবিদ্যার বিভিন্ন বিশেষায়িত কৌশলের সহায়তা নিতে তাঁদের খুব একটা দেখা যায়নি। এর অর্থ এই নয় যে সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীদের কেউ কখনো জরীপ বা পরিসংখ্যান-নির্ভর অন্যান্য গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করেন না।

তবে অনেক ক্ষেত্রেই সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় বা লক্ষ্য এমন থাকে যে, সেখানে এ ধরনের পদ্ধতি খুব একটা কার্যকর বলে গণ্য করা যায় না। যেমন, কোন এলাকায় বিশেষ কোন উৎস থেকে প্রাপ্ত দূষিত পানি কতজন কি কাজে নিয়মিত ব্যবহার করে, তা মাপা সম্ভব, কিন্তু স্থানীয় প্রেক্ষিতে ‘ভালো পানি’ বা ‘খারাপ পানি’ ধরনের কোন ধারণা বিদ্যমান থাকতে পারে যেগুলো সম্পর্কে জানতে হলে নজর দিতে হবে অন্যত্র, সেখানকার সংস্কৃতির উপর।

অবশ্য সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীরাও জানতে চাইতে পারেন বিবিধ কাজে পুকুরের পানি কারা কতটা ব্যবহার করে, এমন কোন বিষয় সম্পর্কে। সেক্ষেত্রে যদি বিশাল কোন জনগোষ্ঠীর উপর তাঁরা কাজ করেন, তাহলে নমুনা-ভিত্তিক জরীপের সাহায্য দরকার হতে পারে।

 

আরও দেখুনঃ

 

 

Leave a Comment