শিকারী সমাজের অবসান ও তার কারণ

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় শিকারী সমাজের অবসান ও তার কারণ

শিকারী সমাজের অবসান ও তার কারণ

 

শিকারী সমাজের অবসান ও তার কারণ

 

শিকারী সমাজের অবসান ও তার কারণ

পুরোপলীয় যুগের সংস্কৃতি অনেক উচ্চ পর্যায়ে আরোহণ করা সত্ত্বেও আজ থেকে প্রায় দশ বার হাজার বছর আগে তা লোপ পায়। তারপর পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গায় কৃষির উপর ভিত্তি করে নতুন সমাজ গড়ে ওঠে। উচ্চ পুরোপলীয় যুগে মানুষের শিকারের হাতিয়ার ও কৌশল এবং তাদের সমাজ সংগঠন এতদূর উন্নতি লাভ করেছিল যে, প্রশ্ন জাগতে পারে, শিকারী সমাজই পৃথিবীতে স্থায়ী হয়নি কেন? তার বদলে পৃথিবীতে অন্য সমাজের উদয় হল কেন?

পৃথিবীতে শিকারী মানুষের সমাজ অন্তত মানুষের উৎপত্তির শুরু থেকে আট দশ লক্ষ বছর স্থায়ী হয়েছিল, আমরা তা দেখেছি। দশ বার হাজার বছর আগে যদি শিকারী যুগের অবসান না ঘটত, তাহলে আজও সারা পৃথিবীতে একমাত্র পশুশিকারী দলই বিচরণ করত। তার বদলে আমরা দেখি মানুষ আজ কারখানায় মোটর গাড়ি, এরোপ্লেন তৈরি করেছে, রকেটে চড়ে চাঁদে যাচ্ছে। শুধু সময়ের সাথে সাথে মানুষের জ্ঞান বুদ্ধি বেড়েছে এবং মানুষ এত উন্নতি করেছে— তা ঠিক নয়।

গত দশ বার হাজার বছরের কথা বাদ দিলেও শিকারী মানুষ এরকম অনেক অনেক দশ বার হাজার বছর ধরে অর্থাৎ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে, কিন্তু তাদের বস্তুগত বা মানসিক সংস্কৃতির বিকাশ একটা বিশেষ গণ্ডি ছাড়িয়ে কখনও উঠতে পারেনি। আদিমসমাজের কতগুলো সীমাবদ্ধতাই এজন্য দায়ী। আদিম শিকারী মানুষ শিকারের যত কলাকৌশলই আবিষ্কার করে থাকুক না কেন, তারা ছিল প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল পরগাছা বিশেষ।

পশুর পালের সন্ধান পেলে তারা পশু শিকার করতে পারত বটে, কিন্তু পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি করার কোনো উপায় তাদের হাতে ছিল না। তাদের ভাবাদর্শও এ বিষয়ে তাদের কোনো সাহায্য করতে পারেনি। পশুর বংশবৃদ্ধির জন্য টোটেম উৎসব করলেই তো সত্যি সত্যি তাতে পশুর সংখ্যা বাড়ত না। আদিম যুগে মানুষ তাই প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখেনি। পরবর্তীকালে মানুষ কৃষিকাজ এবং পশুপালনের কৌশল আয়ত্ত করে নিজেদের খাদ্যের যোগান বাড়াতে পেরেছিল।

কিন্তু আদিম মানুষ কেবল পশুহত্যা করে, নিজেদের খাদ্যের উৎস ধ্বংস করে, খাদ্য সংকট বাড়াতেই পারত, খাদ্যের যোগান বাড়াতে পারত না। আদিম শিকারী সমাজকে বলা হয় মানুষের বন্যদশা। বন্য সমাজের অর্থনীতি তাদের জন্য এক অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছিল। হিসাব করে দেখা গেছে, মানুষ শুধুমাত্র শিকারের উপর নির্ভর করলে অবস্থা অনুযায়ী মাথাপিছু ৭ থেকে ৫০০ বর্গমাইল জমি লাগে।

অর্থাৎ যদি শিকার সুলভ হয় তবে ৭০০ বর্গমাইল জায়গায় ১০০ জন মানুষ শিকার করে খেয়ে বাঁচতে পারবে। আর যদি আবহাওয়া প্রতিকূল হয় ও শিকার দুর্লভ হয়, তবে ১০০ জন মানুষের সারা বছরের খাদ্য সরবরাহ করতে পারে ৫০ হাজার বর্গমাইল এলাকার পশু ও প্রাণী। পৃথিবীর স্থলভাগের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি বর্গমাইল। মাথাপিছু কম করে ৭ বর্গমাইল জমি ধরলেও শিকারী যুগে সারা পৃথিবীর মানুষের সংখ্যা ৭০ লক্ষের বেশি কোনোক্রমেই হতে পারত না।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

অর্থাৎ দশ বার হাজার বছর আগে শিকারী সমাজের চরম উন্নতির যুগে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭০ লক্ষের চেয়ে বাড়তে পারছিল না।
শিকারী যুগের বন্য অর্থনীতির এ অন্তর্নিহিত দুর্বলতা মানবসমাজের সামনে এক অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছিল। এ দুর্বলতা দূর করতে না পারলে ঐ অচলাবস্থা দূর হত না এবং বন্য মানুষ দুর্লভ প্রাণীরূপেই পৃথিবীতে বাস করত। আর এ দুর্বলতা দূর করার একমাত্র পথ ছিল খাদ্য উৎপাদনের নতুন উপায় বের করা।

প্রায় দশ হাজার বছর আগে চতুর্থ বরফ যুগ শেষ হয়েছিল, একথা আমরা আগেই বলেছি। আজ থেকে বার তের হাজার বছর আগে যখন ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্য ও দক্ষিণ ভাগে বরফ গলতে শুরু করল, তখন হিমবাহ অঞ্চল ক্রমশ উত্তরে সরতে লাগল। বরফের প্রান্ত যত উত্তরে সরতে লাগল বল্গা হরিণও ততই উত্তরে সরে যেতে লাগল। বল্গা হরিণের পিছন পিছন অনেক শিকারী দলও উত্তরে যাত্রা করল।

অবশ্য একদিনে এটা হয়নি। কয়েক শ বা কয়েক হাজার বছর ধরে একটু একটু করে মানুষ বলা হরিণের পিছন পিছন চলে মেরু অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছেছে, যেখানে এখনও চিরতুষারের রাজত্ব চলছে। আদিম শিকারীর যে বংশধররা বরফাচ্ছন্ন তুন্দ্রা অঞ্চলে বল্গা হরিণ, সাদা ভালুক আর সিন্ধুঘোটক শিকার করে জীবন বাঁচায় তারাই আমাদের বহু পরিচিত এস্কিমো। তাদের জীবনে এখন পর্যন্ত বরফ যুগের শিকারী জীবনের অবসান ঘটেনি।

কিন্তু এস্কিমোদের মতো সহজ সমাধান সব মানুষের জন্য ছিল না। বরফ যুগের অবসানের ফলে ম্যামথ এবং অন্যান্য অনেক শীতের প্রাণী লোপ পেয়ে যায়। এর ফলে শিকারী মানুষরা তীব্র সঙ্কটের মধ্যে পড়ে। এ সঙ্কট থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো উপায় আদিম সমাজের গণ্ডির মধ্যে ছিল না। যে অনুকূল পরিবেশে পুরোপলীয় যুগের বন্য সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করেছিল, তা দূর হয়ে যাওয়া মাত্র অর্থাৎ শিকারের পশু বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মাত্র আদিম সমাজ ক্রমশ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেল।

তারপর পশ্চিম এশিয়ার কোনো অঞ্চলের মানুষ যখন কৃষিকাজ আয়ত্ত করল তখন কৃষিভিত্তিক উন্নত সংস্কৃতি ক্রমশ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। এদের সংস্পর্শে এসে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের বন্য সমাজ বা শিকারী সমাজের মানুষরা কৃষিকাজ আয়ত্ত করল। এ প্রক্রিয়াতে ধ্বংসোন্মুখ আদিম সমাজ বিলুপ্ত হয়ে কৃষিভিত্তিক সমাজে রূপান্তরিত হল। অবশ্য তার পরেও পৃথিবীর নানা দুর্গম অঞ্চলে বন্য শিকারী সমাজ টিকে ছিল।

যেমন, আফ্রিকার কোনো কোনো অঞ্চলে, মালয়ের জঙ্গলে, প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো কোনো দ্বীপে, উত্তরের তুন্দ্রা অঞ্চলে, সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত আদিম শিকারী মানুষরা তাদের আদিম সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে টিকে ছিল। তা ছাড়া এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার দরুন পুরো অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে দু’তিনশ বছর আগে পর্যন্ত কেবল মাত্র বন্য শিকারী সমাজই ছিল একমাত্র মানব সমাজ।

মানব সমাজের মূল অংশ এবং মূল ধারা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকার দরুন উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বিস্তৃত অঞ্চলেও কয়েকশ’ বছর আগে পর্যন্ত আদিম শিকারী সমাজ বিদ্যমান ছিল। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করার পর এবং ক্যাপ্টেন কুক প্রমুখ অভিযাত্রীরা অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পথ আবিষ্কার করার পর এসব দেশে ইউরোপীয়রা গিয়ে পৌঁছায় এবং তার পরই মাত্র এ সকল আদিম সমাজের মানুষদের মধ্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

 

শিকারী সমাজের অবসান ও তার কারণ

 

যা হোক, পৃথিবীর কোনো কোনো অংশে শিকারী সমাজ এ ভাবে টিকে থাকলেও আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে কৃষিভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মানুষের প্রধান সমাজব্যবস্থা হিসাবে আর শিকারী সমাজ থাকতে পারল না। তখন থেকে কৃষিভিত্তিক সমাজই পৃথিবীতে মূল সমাজব্যবস্থা হয়ে উঠল। এ নতুন সমাজ সম্পর্কে আমরা পরের অধ্যায়ে আলোচনা করব।

আরও দেখুন :

Leave a Comment