নৃবিজ্ঞান ও অন্যান্য জ্ঞানকান্ড

নৃবিজ্ঞান ও অন্যান্য জ্ঞানকান্ড নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “নৃবিজ্ঞান পরিচিতি” বিষয়ের একটি পাঠ। নৃবিজ্ঞানের সাথে অন্যান্য জ্ঞানকান্ডের যোগসূত্র সম্পর্কে আগের পাঠগুলো থেকেই কিছুটা ধারণা আপনি পেয়েছেন। পৃথিবীর সকল স্থানের ও সকল কালের মানুষদের অধ্যয়নের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত জ্ঞানকান্ড হিসাবে নৃবিজ্ঞানকে সংগঠিত করার প্রয়াসে নৃবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন জ্ঞানকান্ড থেকে অনেক কিছু নিয়েছেন।

নৃবিজ্ঞান ও অন্যান্য জ্ঞানকান্ড

নৃবিজ্ঞান ও অন্যান্য জ্ঞানকান্ড | নৃবিজ্ঞান পরিচিতি

 

দৈহিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানে প্রাগৈতাহিসক যুগের মানুষের জীবাশ্ম ও তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্রের বয়স নির্ধারণের জন্য ব্যবহৃত কৌশলগুলো এসেছে ভূতত্ত্ব, পদার্থবিজ্ঞান ও রসয়ানশাস্ত্র থেকে। প্রাগৈতাহিসক মানুষদের রেখে যাওয়া বিভিন্ন চিহ্নের সাথে প্রাপ্ত অন্যান্য জৈব নমুনা বিশ্লেষণের কাজে জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হয়।

আর বলা বাহুল্য, মানব বিষয়ক যত ধরনের বিজ্ঞান আছে, তার প্রায় প্রতিটার সাথে নৃবিজ্ঞানের কোন না কোন যোগসূত্র রয়েছে। তবে মানব বিষয়ক অন্যান্য জ্ঞানকান্ডের সাথে নৃবিজ্ঞানের পার্থক্য হল এই যে, অন্যান্য জ্ঞানকান্ড যেখানে বিশেষ কোন দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের বিষয়বস্তুর সীমানা নির্ধারণ করে রেখেছে, সেখানে নৃবিজ্ঞানে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ সমন্বিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, এবং বিষয়বস্তুর কোন সুনির্দিষ্ট সীমানা বেঁধে দেওয়া নেই।

বাস্তবে অবশ্য নৃবিজ্ঞানকে মানব বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান বলার দিন আর নেই। যেমন, আজকাল দৈহিক বা জৈবিক নৃবি-জ্ঞানের সাথে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের সংযোগ খুবই ক্ষীণ হয়ে গেছে। অতীতে বিবর্তনের ধারণা বা ‘আদিম সমাজ’-কেন্দ্রিক গবেষণা বিভিন্ন শাখার নৃবি-জ্ঞানকে সমন্বিত করতে সহায়তা করেছিল, কিন্তু সে অবস্থা এখন আর দেখা যায় না। কাজেই নৃবি-জ্ঞানের সাথে অন্যান্য জ্ঞানকান্ডের সম্পর্ক আলোচনা করতে গেলে দেখতে হবে আমরা কোথাকার ও কবেকার কোন ধরনের নৃবি-জ্ঞান নিয়ে কথা বলছি।

এক্ষেত্রে আমরা মূলতঃ নজর দেব সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবি-জ্ঞানের সাথে অন্যান্য জ্ঞানকান্ডের সম্পর্কের উপর। এ প্রসঙ্গে যে বিষয়টা মনে রাখা সুবিধাজনক হবে তা হল, নৃবি-জ্ঞানের মতই অন্যান্য জ্ঞানকান্ডেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। ফলে সাধারণভাবে বিভিন্ন জ্ঞানকান্ডের মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে গেছে। একই সাথে প্রথাগতভাবে চর্চিত বিভিন্ন জ্ঞানকান্ডের রূপান্তর ও মিথস্ক্রিয়ায় গড়ে উঠছে নূতন নূতন নামে পরিচিত জ্ঞানকান্ড, যেগুলোকে সনাতনী কোন শ্রেণীকরণ অনুযায়ী সাজানো যায় না।

 

নৃবিজ্ঞান ও অন্যান্য জ্ঞানকান্ড | নৃবিজ্ঞান পরিচিতি

 

নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান:

সামাজিক বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে তিনটি সুপরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানকান্ড হল সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান, যেগুলির সাথে ঐতিহ্যগতভাবে নৃ-বিজ্ঞানের পার্থক্য গড়ে উঠেছে এক ধরনের বিদ্যাজাগতিক শ্রমবিভাজনের ভিত্তিতে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজকে মোটা দাগে ভাগ করার জন্য কিছু জোড় পদ ব্যবহার করা হয়, যেমন আদিম-আধুনিক, সরল-জটিল, অসাক্ষর- সাক্ষর, প্রাক-শিল্পযুগীয়-শিল্পায়িত ইত্যাদি।

এগুলির দ্বিতীয় পদসমূহ দিয়ে নির্দেশিত সমাজগুলোর প্রতিই মূলতঃ সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নজর কেন্দ্রীভূত থেকেছে। অন্যদিকে নৃবি-জ্ঞানে বেশী নজর দেওয়া হয়েছে উল্লিখিত তালিকার প্রথম পদগুলো দিয়ে চিহ্নিত সমাজগুলোর প্রতি।

এছাড়া সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অধ্যয়নের মূল বিষয় হিসাবে যথাক্রমে সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি ধারণা দিয়ে চিহ্নিত পৃথক পৃথক ক্ষেত্র বেছে নেওয়া হলেও নৃবি-জ্ঞানে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়সমূহের কোন কোন একটি দিকের উপর আলাদা করে বেশী নজর দেওয়া হয় নি।

মনে করা হয় যে, নৃবি-জ্ঞানীরা ঐতিহ্যগতভাবে যে ধরনের সমাজ নিয়ে গবেষণা করতেন, সে ধরনের সমাজে এই বিষয়গুলোকে বাস্তবে সবসময় আলাদা করেও দেখা সম্ভব ছিল না। কিছু উদাহরণ দিলেই নৃবি-জ্ঞানের সাথে আলোচ্য অন্য তিনটি সামাজিক বিজ্ঞানের ঐতিহ্যগত পার্থক্যগুলো বোঝা যাবে।

নৃবি-জ্ঞানীরা সমাজের সংগঠন দেখতে গিয়ে জ্ঞাতিসম্পর্ক, বিয়ে ও বংশধারার প্রতি প্রচুর মনোযোগ দিয়েছেন, কারণ সরল বা আদিম বলে বিবেচিত যে ধরনের সমাজ সম্পর্কে নৃবি-জ্ঞানীরা প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভে সচেষ্ট ছিলেন, সে ধরনের সমাজের প্রেক্ষিতে এই বিষয়গুলোকে দেখা হয়েছে সমাজ কাঠামোর মূল ভিত্তি হিসাবে।

এ ধরনের সমাজে বিত্ত, ক্ষমতা বা মর্যাদার তারতম্যের ভিত্তিতে প্রকট কোন সামাজিক অসমতা নৃবি-জ্ঞানীরা দেখেন নি, ফলে সামাজিক স্তরবিন্যাস, শ্রেণী ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে তাঁদের সচরাচর যেতে হয় নি। পক্ষান্তরে জ্ঞাতিসম্পর্কের মত বিষয়ের তুলনায় শেষোক্ত বিষয়াদি নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের অনেক বেশী মাথা ঘামাতে হয়েছে।

নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অপেক্ষাকৃত সরল ধরনের সমাজের প্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক হিসাবে আলাদা করে শনাক্ত করা যায়, এমন কর্মকান্ড বা প্রতিষ্ঠানও বিরল। বরং জ্ঞাতিসম্পর্কের মত বিষয়ের সাথেই অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বিষয়াবলী ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে বলে মনে করা হয়।

এ ধরনের সমাজে ‘বাজার ব্যবস্থা’ বলে কিছু ছিল না বা থাকলেও সেটাই অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মূল নির্ধারক ছিল না। ফলে যেখানে অর্থনীতিবিদরা ব্যস্ত থেকেছেন বাজার ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি বোঝার কাজে, সেখানে নৃবি-জ্ঞানীদের অনেকে দেখতে চেয়েছেন বাজার ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে বা এর বাইরে বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্কের সূত্র ধরে কিভাবে অর্থনৈতিক লেনদেন সম্পন্ন হয়।

একইভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের নজরের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্র (লক্ষ্যণীয় যে, Political Science-এর বাংলা করা হয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, যেনবা রাজনৈতিক কর্মকান্ড একমাত্র রাষ্ট্রকে ঘিরেই সংঘটিত হয়), সেখানে নৃবি-জ্ঞানীরা এমন সমাজের কথা বলেন যাদের মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থা বা ক্ষমতার কোন কেন্দ্রীভূত রূপ ছিল না। এ ধরনের ক্ষেত্রে ক্ষমতা বা রাজনীতি বলতে কি বোঝায়? এসব প্রশ্নের উত্তর নৃবি-জ্ঞানীরা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

 

 

নৃবিজ্ঞান ও অন্যান্য জ্ঞানকান্ড | নৃবিজ্ঞান পরিচিতি

 

পদ্ধতিগতভাবে অপেক্ষাকৃত সরল ধরনের সমাজ অধ্যয়নের জন্য নৃবি-জ্ঞানীরা মূলতঃ নির্ভর করেছেন এধরনের সমাজে দীর্ঘদিন বাস করে তাদের সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের উপর। পক্ষান্তরে বৃহদায়তনের জটিল সমাজ অধ্যয়নের জন্য অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানে জরীপ, প্রশ্নমালা, পরিসংখ্যান প্রভৃতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। নৃবি-জ্ঞানীরা ক্ষুদ্র পরিসরে নিবিড় অধ্যয়নের উপর মনোনিবেশ করতে গিয়ে গুণগত উপাত্তের উপর বেশী জোর দিয়েছেন, অন্যদিকে অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানীরা বৃহৎ পরিসরে প্রচুর পরিমাণ পরিমাপযোগ্য উপাত্ত সংগ্রহের উপর জোর দিয়েছেন।

উপরে আলোচিত পার্থক্যগুলো অবশ্য মোটা দাগের, যেগুলো সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে আর ততটা প্রযোজ্য নয়। বিষয়বস্তু ও গবেষণাক্ষেত্র নির্বাচন বা গবেষণাকৌশলের দিক থেকে এখন অনেক নৃবি-জ্ঞানীই অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানীদের মত করেই কাজ করছেন। এর উল্টোটাও সত্য। সমাজবিজ্ঞানীরাও অনেকে নৃবৈজ্ঞানিক ধাঁচে ক্ষুদ্র পরিসরে নিবিড় মাঠকর্ম করেছেন। এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাও সবাই এখন আর রাজনীতি অধ্যয়নের জন্য রাষ্ট্রের উপর নজর কেন্দ্রীভূত রাখে না। এদিক থেকে অর্থনীতি বা রাজনীতি অধ্যয়নের ক্ষেত্রকে সম্প্রসারিত করে তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গী সংযোজনে নৃবি-জ্ঞানীরাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

 

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment