নৃবিজ্ঞানে উন্নয়ন-এর দুই প্রকার ধারণা

আজকের আলোচনার বিষয় নৃবিজ্ঞানে উন্নয়ন-এর দুই প্রকার ধারণা – যা উন্নয়ন ভাবনা এবং তৃতীয় বিশ্বে গবেষণা এর অর্ন্তভুক্ত, এখানে প্রাসঙ্গিক একটা বিষয়ে কিছু আলাপ করা হবে। নৃবিজ্ঞানের জগতে উন্নয়ন ধারণাটির অর্থ নিয়ে এই আলাপ। পশ্চিমা সমাজের দর্শন এবং সংস্কৃতিতে উন্নয়ন ধারণাটি একেবারে কেন্দ্রীয়। নৃবিজ্ঞান শাস্ত্রে এর অর্থ দুইভাবে দেখা দিয়েছে। একটি অপেক্ষাকৃত পুরোনো কালের নৃবিজ্ঞানের বিষয় এবং তুলনামূলকভাবে বড় প্রেক্ষাপটে তার অর্থ নির্দিষ্ট ছিল। অন্যটি সেই তুলনায় সাম্প্রতিক নৃবিজ্ঞানের বিষয় এবং আরও নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে এর অর্থ ক্রিয়াশীল।

নৃবিজ্ঞানে উন্নয়ন-এর দুই প্রকার ধারণা

 

নৃবিজ্ঞানে উন্নয়ন-এর দুই প্রকার ধারণা

 

উন্নয়নের প্রথম ধারণাটি ঊনবিংশ শতকের নৃবিজ্ঞানের বিবর্তনবাদী চিন্তার একেবারে কেন্দ্রীয় ধারণা। এখানে সমগ্র মানবসমাজের ইতিহাসকে দেখা হত সোজাসুজিভাবে। ধারণা করা হ’ত যে, মানুষ ‘বন্যতা’ এবং ‘বর্বরতা’র ধাপ ডিঙিয়ে সামাজিক বিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ‘সভ্যতা’র দশায় উপনীত হয়। এই যাত্রাকে তাত্ত্বিক আলোচনায় প্রগতি (progress) বলা হয়েছে। লক্ষ্য রাখা দরকার যে, সভ্যতার এই ধারণা বানানো হয়েছিল পশ্চিমের সমাজ মাথায় রেখে। অর্থাৎ, পশ্চিমা সমাজই সভ্য – এই ধারণা থেকেই বিবর্তনের ধাপ ও চিন্তামালা গড়ে উঠেছে।

বিবর্তনবাদী চিন্তার এই উন্নয়নকে বাংলা লেখালেখিতে “বিকাশ” হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে। আবার, বাংলায় বিকাশ ও প্রগতি দুটো শব্দই ইংরেজি ‘প্রোগ্রেস’ শব্দটির অর্থানুবাদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যাই হোক, উন্নয়ন সংক্রান্ত উনিশ শতকের নৃবিজ্ঞানের এই ধারণা খুবই প্রভাব বিস্তার করেছিল – সেটা মনে রাখা জরুরী। 

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

নৃবিজ্ঞানে উন্নয়নের সাম্প্রতিক ধারণাটি আপনারা ইতোমধ্যেই জেনেছেন। বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে এই ধারণাটি গড়ে ওঠে। বিশেষ এই ধারণাতে উন্নয়নকে মূলত আর্থনীতিক প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করে দেখা হয়। এক্ষেত্রে মুখ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত বিষয়গুলো হচ্ছে: উৎপাদন বাড়ানো, ভোগ বাড়ানো, এবং জীবন যাপনের মান বাড়ানো। মূলত গরিব বিশ্বের সমাজের জন্য এই লক্ষ্যগুলো ধার্য করা হয়েছে। এটাও এখানে স্মরণে রাখা দরকার যে, জীবন যাপনের মান বাড়ানো বলতে সাধারণ ভাবে ভোগ বৃদ্ধিকেই বোঝানো হয়ে থাকে। সমাজের মানুষের মধ্যে বৈষম্য বা ফারাক নিয়ে তেমন একটা ভাবনা- চিন্তা করবার রেওয়াজ এই চিন্তাধারাতে নেই।

গত দু’ দশকে দারিদ্র্য বিমোচন করবার একটা উদ্যোগ উন্নয়ন পরিকল্পনাতে নেয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে সেটাও উন্নয়ন ধারণার মত কপট। তাঁদের বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায় গরিব বিশ্বের সমাজগুলোর বাস্তবতা দেখে। নৃবিজ্ঞান জ্ঞানকাণ্ডের ইতিহাসে উন্নয়ন সংক্রান্ত যে দুই প্রকার ভাবনা পাওয়া যায় তাকে আলাদা আলাদা করে দেখে থাকেন কেউ কেউ । কিন্তু নৃবিজ্ঞানে উন্নয়ন ধারণা কাজ করেছে কিভাবে তার হদিস নিতে গেলে এই দুই প্রকারের – ভাবনাকে একত্রেই বুঝতে হবে। তাছাড়া ফলিত নৃবিজ্ঞানের গড়ে ওঠার সাথে এই দুই ভাবনারই নিবিড় যোগাযোগ আছে।

 

নৃবিজ্ঞানে উন্নয়ন-এর দুই প্রকার ধারণা

 

কারণ, নৃবিজ্ঞানের প্রথম জমানায় ‘সভ্যতা’র ধারণা নৃবিজ্ঞানীদেরকে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত করেছে; আর পরের জমানায় ‘সমৃদ্ধি’র ধারণা নৃবিজ্ঞানীদেরকে আন্তর্জাতিক ক্ষমতা- নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে। দুটো ধারণাই উন্নয়নের ধারণা। তবে প্রাসঙ্গিক বিষয় হচ্ছে, বর্তমানের সম্পর্কটা ফলিত নৃবিজ্ঞানের পরিচয়ে কাজ করছে।

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment