আজকের আলোচনার বিষয় জাদু, ধর্ম ও বিজ্ঞান: ফ্রেজারের বিশ্লেষণ – যা জাদু ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক এর অর্ন্তভুক্ত, ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী জেমস ফ্রেজার জাদু, ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যেকার পার্থক্য এবং সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তাঁর The Golden Bough নামক বিখ্যাত একটি গ্রন্থে। তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য বিবর্তনবাদী নৃবিজ্ঞানীদের মত তিনিও আগ্রহী ছিলেন ধর্মের উৎপত্তি ব্যাখ্যায়।
তাঁর মতে মানব সমাজে জাদুর অস্তিত্ব ছিল ধর্মের উৎপত্তির আগে। জাদুর সাহায্যে অতিপ্রাকৃতকে আয়ত্তে আনা সম্ভব নয়, এই উপলব্ধি থেকে প্রকৃত ধর্মীয় চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল বলে ফ্রেজার মনে করেন। প্রকৃত ধর্মীয় চেতনা বা দৃষ্টিভঙ্গী বলতে টাইলর সেই অবস্থাকে বুঝিয়েছেন যখন মানুষ মনে করে যে অতিপ্রাকৃত শক্তি বা সত্তাসমূহ তার আজ্ঞাধীন নয়, এবং এই উপলব্ধি তার মধ্যে অতিপ্রাকৃতের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধার বোধ এনে দেয়।
জাদু, ধর্ম ও বিজ্ঞান: ফ্রেজারের বিশ্লেষণ
প্রার্থনা হচ্ছে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গীর উদাহরণ। আমরা দেব-দেবী বা ইশ্বরের কাছে বিশেষ কিছু চাইতে পারি, কিন্তু এটা ধরে নিতে পারি না যে, যা আমরা চাইব, তা পাবই। পক্ষান্তরে জাদু-বিশ্বাস অনুসারে নির্দিষ্ট কোন কলাকৌশল যথাযথভাবে প্রয়োগ করলে কাঙ্খিত ফলাফল আসতে বাধ্য। ধর্মে মানুষ অতিপ্রাকৃতের ইচ্ছ-অনিচ্ছার কাছে নিজেকে সঁপে দেয়, কিন্তু জাদুতে সে চেষ্টা করে অতিপ্রাকৃতকে বশে আনার। এদিক থেকে জাদু-বিশ্বাসের মধ্যে এক ধরনের ঔদ্ধত্য কাজ করে।
ফ্রেজার মনে করেন আদিম মানুষ ইচ্ছা-পূরণের উপায় মনে করে জাদুর উদ্ভাবন ঘটিয়েছিল। চারপাশের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক বা যোগসূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করেছিল এবং সেগুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিল। এক্ষেত্রে দুই ধরনের অনুমানের ভিত্তিতে জাদুবিশ্বাস ও সংশ্লিষ্ট কলাকৌশলের উদ্ভাবন ঘটানো হয়েছে বলে ফ্রেজার মনে করেন। এক ধরনের অনুমান হচ্ছে এই যে, সদৃশ বস্তুসামগ্রীর ব্যবহার ও অনুকরণমূলক ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে কাঙ্খিত ফলাফল অর্জন সম্ভব। যেমন, কোন ব্যক্তিকে হত্যার লক্ষ্যে যদি তার প্রতিমূর্তি বানিয়ে সেটাকে অনবরত খোঁচানো হয়, তবে এক্ষেত্রে উক্ত অনুমান কাজ করছে।
এ ধরনের জাদু হচ্ছে অনুকরণমূলক বা সাদৃশ্যনির্ভর (imitative or homeopathic magic)। দ্বিতীয় যে আরেক ধরনের অনুমানের ভিত্তিতে অনেক জাদু কাজ করে তা হল এই যে, কোন ব্যক্তি বা বস্তুর উপর প্রভাব বিস্তার করা যায় তার সাথে সংস্পর্শে ছিল বা থাকবে, এমন কোন কিছুর মাধ্যমে। যেমন, কোন ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের বা তাকে বশ করার লক্ষ্যে তার মাথার চুল, নখ ইত্যাদি ব্যবহার করা হতে পারে, অথবা বিশেষ উপায়ে তৈরী কোন দ্রব্য তার সংস্পর্শে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এ ধরনের জাদু হচ্ছে সংস্পর্শ-নির্ভর (contagious magic)।
ফ্রেজারের তত্ত্ব অনুসারে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথে ক্রমান্বয়ে জাদু-বিশ্বাস, ধর্মীয় চেতনা ও বিজ্ঞানমনস্কতার আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী জাদুবিশ্বাসের ভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে মানুষ যুক্তির একটি উর্ধ্বতন স্তরে তার বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে দেব-দেবী বা ইশ্বরের ধারণা গড়ে তোলে এবং এসব সত্তার প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করে। অন্যদিকে জাদু- বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের মধ্যে একটা ক্ষেত্রে মিল আছে, তা হল, জাদু-চর্চাকারী ও বিজ্ঞানী, উভয়েই ধরে নেয় যে, যথোপযুক্ত পরিবেশে সঠিক পন্থায় ‘ক’ কাজটি সম্পাদিত হলে যথাসময়ে “খ” ফলাফল পাওয়া যাবে।
এক্ষেত্রে কে কাজটি করল, উদ্দীষ্ট ফলাফল সম্পর্কে তার মনোভাব কি, এগুলো বিচার্য নয়। পক্ষান্তরে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী বলতে ফ্রেজার যা বুঝিয়েছেন, তাতে মানুষের মনের ভেতরে কি রয়েছে, সে বিষয়টাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে জাদুর কলাকৌশলের পেছনে সচরাচর কোন সুনির্দিষ্ট কার্য-কারণ সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না, তাই ফ্রেজারের ভাষায় জাদু হচ্ছে ‘ভ্রান্ত বিজ্ঞান’।
জাদু, ধর্ম ও বিজ্ঞান ধারণাসমূহ ফ্রেজার যে ধরনের অর্থে ব্যবহার করেছেন, সেগুলি বোঝানোর জন্য এখানে আমরা কিছু বাস্তব উদাহরণ বিবেচনায় নিতে পারি। জাদুর একটি উদাহরণ হিসাবে বৃষ্টির আশায় ‘ব্যাঙের বিয়ে’ দেওয়ার রীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটু ভাবুন, কোন্ অর্থে এই রীতির পেছনে জাদু-বিশ্বাস ক্রিয়াশীল? আল্লাহ্ বা ইশ্বরে বিশ্বাসী কোন ব্যক্তি হয়ত বলবেন, বৃষ্টি নামা না নামা সম্পুর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে, কাজেই বৃষ্টি চাইলে ‘মোনাজাত’ করাই শ্রেয়।
পক্ষান্তরে একজন বিজ্ঞানী প্রকৃতির বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বৃষ্টির সম্ভাব্যতা নিরূপণ করবেন, এবং, তিনি আস্তিক বা নাস্তিক যাই হোন না কেন, আকাশে বিশেষ কোন পদার্থ ছড়িয়ে দিয়ে মেঘ তৈরী করে বৃষ্টি নামানোর কোন ব্যবস্থা থাকলে তিনি প্রয়োজনে তা কাজে লাগাবেন। ‘ব্যাঙের বিয়ে’ দিলে বৃষ্টি হবেই, এটা ধৰ্মীয় যুক্তি বা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। সেই অর্থে এই রীতির পেছনে কাজ করছে এক ধরনের জাদু বিশ্বাস।
জাদু ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক অধ্যায়ের সারাংশ:
আজকের আলোচনার বিষয় জাদু ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক অধ্যায়ের সারাংশ – যা জাদু ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক এর অর্ন্তভুক্ত, ধর্মের নৃবিজ্ঞানে জাদু একটি বহুল আলোচিত প্রত্যয়।
অতিপ্রাকৃত শক্তি বা সত্তাসমূহকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে অনুসৃত বিভিন্ন কলাকৌশল বা তৎসংক্রান্ত বিশ্বাসকে বোঝাতে নৃবিজ্ঞানে জাদু ধারণা ব্যবহার করা হয়। ফ্রেজারের মতে, জাদু হচ্ছে অতিপ্রাকৃত শক্তি ও সত্তাসমূহের অস্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মানুষের ধারণা বিকশিত হওয়ার পূর্বতন ধাপ।
অতিপ্রাকৃত সত্তাসমূহ যে মানুষের নিয়ন্ত্রণের উর্ধ্বে, এই উপলব্ধি জন্মানোর পর সূচিত হয় প্রকৃত ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী, যখন মানুষ এই সত্তাসমূহের কাছে নতি স্বীকার করে। ফ্রেজার জাদুকে ‘ভ্রান্ত বিজ্ঞান’ হিসাবে চিহ্নিত করলেও ক্রিয়াবাদী নৃবিজ্ঞানীরা জাদু-ধর্মী বিশ্বাস ও আচার অনুষ্ঠানের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক উপযোগিতা দেখতে পেয়েছেন।
আরও দেখুনঃ

