Site icon Anthropology Gurukul [ নৃবিজ্ঞান গুরুকুল ] GOLN

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি

আজকের আলোচনার বিষয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি – যা উন্নয়ন ভাবনা এবং তৃতীয় বিশ্বে গবেষণা এর অর্ন্তভুক্ত, আপনারা জানেন যে একটা সময় ইউরোপের বাইরের সারা দুনিয়ায় ইউরোপীয় সাম্রাজ্য দখল বসিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই সারা দুনিয়ার নিপীড়িত জাতিসমূহ ইউরোপীয় উপনিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকে। এই লড়াইগুলো আগেও ছিল।

তবে নানান অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এগুলো হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে সেগুলো উপনিবেশের বিরুদ্ধে জোরালো হয়ে উঠতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই সকল আন্দোলন ঔপনিবেশিক শক্তিকে হঠিয়ে দেবার ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য লাভ করতে থাকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি

 

 

আফ্রিকা, এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের মানুষজন স্বাধীনতা লাভ করেন। এই প্রক্রিয়ায় অনেকগুলো জাতিরাষ্ট্র গঠিত হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে: যে সকল রাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করেছে তার সবগুলোই একসময়ে ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনস্ত ছিল। নতুন পরিস্থিতিতে স্বাধীন হওয়া দেশগুলোর সঙ্গে সাবেক ঔপনিবেশিক শাসকদের সম্পর্ক কি হবে তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা দেখা দিল ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর পরিচালকদের মাথায়।

একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই পরিকল্পনায় শরিক হয়ে উঠল। এটাও আমাদের খেয়াল রাখা দরকার যে, আফ্রিকা এবং আফ্রিকা মহাদেশের বাইরে অনেকগুলো দেশ স্বাধীন হবার পরও সেখানকার শাসকরা মূলত ইউরোপের থেকে গেল। যে সকল দেশে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্যে শাসক দেশ থেকে প্রচুর সংখ্যক লোকজন এসে জায়গা-জমি দখল করে নিতে থাকল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তারাই সেইসব দেশের শাসক হয়ে বসল। জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি রাষ্ট্রের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে ।

এই সময়কালে শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে ‘উন্নয়ন’ ধারণাটি আসে। নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন, তারা যথেষ্ট পিছিয়ে আছে এই প্রচারণাটি উন্নয়নের ধারণার ভিত শক্ত করতে – সাহায্য করে। উন্নয়ন ধারণাটিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া এবং উপনিবেশোত্তর (যে সকল সমাজে উপনিবেশ ছিল) সমাজের জন্য সেটাকে আবশ্যিক গ্রহণযোগ্য করে তোলার নিরন্তর প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। এই প্রচারণা উদ্যোগ সফল হয়েছিল। ইতিহাসেই তার প্রমাণ মেলে।

এ জন্যেই ‘উন্নয়ন’কে অনেকে বৈশ্বিক প্রকল্প বলে মনে করেন। অনেক চিন্তাবিদ বিশ্বজুড়ে এই উন্নয়ন প্রকল্পকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, এটা হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসকদের যুদ্ধের পরবর্তী সময়কালের পরিকল্পনা। এর মানে হ’ল: যেহেতু যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নানান কারণে উপনিবেশের প্রত্যক্ষ শাসন হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তাই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবার নতুন পরিকল্পনা তাদের জন্য দরকার হয়ে পড়ল।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

সেই পরিকল্পনার ফসল হচ্ছে উন্নয়নের ধারণা। এই ধারণার মুখ্য দিক হচ্ছে নতুন জাতিসমূহের ‘সংকট’ চিহ্নিত করা। এই ধরনের চিন্তাবিদদের বক্তব্য হচ্ছে, উপনিবেশের সম্পর্ক মোচনের পথে কৌশলগতভাবে উন্নয়নের গল্প ফাঁদা হ’ল। তাতে সাবেক ঔপনিবেশিক আমলা এবং নতুন স্থির হতে না পারা জাতীয়তাবাদী শাসকদের জন্য ক্ষমতার একটা ছাড়পত্র তৈরি হ’ল।

তবে বন্দোবস্তটা নিছক এখানেই থেমে থাকল না। বহুজাতিক কুলীন যারা, ধরা যাক বহুজাতিক বাণিজ্যসংস্থা, তারাও এর শরিক হতে পারল। প্রত্যেকেরই কাজ দাঁড়াল যেটা এরই মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে – নতুন জাতিরাষ্ট্রের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা। সেই এক – পুরোনো কাহিনী। কিভাবে রাষ্ট্রসমূহ ‘পশ্চাৎপদতা’ থেকে ‘আধুনিকতা’র দিকে যাত্রা করতে পারে। চিন্তাবিদ পার্থ চট্টোপাধ্যায় সহ অনেকেই এ নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে উন্নয়নের এই ধারণা ও আলাপ-আলোচনা কপট ।

উন্নয়ন নিয়ে এইসব আলাপ আলোচনার প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠল একটার পর একটা উন্নয়ন সংস্থা – প্রথমে আন্তর্জাতিক এবং আস্তে আস্তে দেশীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছরের মধ্যেই এসব ঘটতে শুরু করে দিয়েছিল। এর প্রভাব এবং ফলাফল নানামুখী হয়ে উঠল তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যে বিষয়টা আমাদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে: এই প্রক্রিয়ার ফলাফল হিসেবে অনুদান এবং ঋণ আসতে শুরু করল। তাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বড় বড় সব পদ তৈরি হ’ল। সেই সকল পদে এমন বিশেষজ্ঞরা কাজ পেতে শুরু করলেন যাঁদের প্রশিক্ষণকে নতুন এই জাতিরাষ্ট্রগুলির বদলের জন্য জরুরী হিসেবে দেখানো হচ্ছিল, ভাবানো হচ্ছিল।

 

 

বিশাল এই চক্রের মধ্যেই উন্নয়ন এবং নৃবিজ্ঞান কাছাকাছি আসতে পেরেছে। তার মানে, স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্রগুলির উন্নয়ন পরিকল্পনায় নৃবিজ্ঞানীদেরও ডাক আসতে শুরু করল। আপনাদের মনে পড়বে ম্যালিনোস্কির বক্তব্য যেখানে বাস্তবানুগ নৃবিজ্ঞানের কথা বলা হয়েছে। ‘উন্নয়ন’ ধারণার যুগে নৃবিজ্ঞানের বাস্তবানুগ হওয়া বলতে বোঝা হ’ল উন্নয়ন পরিকল্পনায় নৃবিজ্ঞানীদের অংশগ্রহণ। আর এই পরিকল্পনা করে দিতে থাকল সাবেক ঔপনিবেশিক প্রভুরা।

আরও দেখুনঃ

Exit mobile version