আজকের আলোচনার বিষয় চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্র – যা রাষ্ট্রবিহীন ব্যবস্থা এর অর্ন্তভুক্ত, এখানে অতি সংক্ষেপে চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করলেই খানিকটা পরিষ্কার হবে ইউরোপের ভূমিকা এবং প্রথম যুগের অধিকাংশ নৃবিজ্ঞানীর ভূমিকা।
নৃবিজ্ঞানীদের অনেকেই চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্রকে দেখতে চেয়েছেন ব্যান্ড বা ট্রাইবাল সমাজের চেয়ে উৎকৃষ্ট এবং গোছালো রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে। এখানে আবার স্মরণে আনা দরকার যে রাষ্ট্রবিহীন ব্যবস্থার থেকে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে উন্নত এবং উৎকৃষ্ট হিসেবে দেখা হয়েছে।
চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্র

নৃবিজ্ঞানীরা রাষ্ট্রবিহীন ব্যবস্থার মধ্যে ব্যান্ড সমাজের থেকে ট্রাইব বা ক্ষুদ্র-জাতি সমাজকে উন্নত ভেবেছেন এবং চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্রকে ভেবেছেন এর থেকে উন্নত। বিবর্তনবাদী চিন্তার প্রভাবে এই রকম দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। এর মানে রাজনৈতিক ব্যবস্থাতে ক্রমশ নিচু স্তর থেকে উঁচু স্তর দেখা হয় এভাবে
ব্যান্ড সমাজ~~> ট্রাইব বা লোক- “উপজাতি” –> চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্র –> রাষ্ট্র ব্যবস্থা
ব্যান্ড সমাজে এবং ক্ষুদ্র-জাতিগত সমাজে সামাজিক নিয়ম কানুন রক্ষা করা এবং শাস্তি বিধানের জন্য যেখানে শিথিল এবং অনাড়ম্বর পদ্ধতি ছিল, মুখিয়াতন্ত্রে এই পদ্ধতিগুলো কঠোর এবং আড়ম্বর হিসেবে দেখা দিল। অনেক নিয়ম-কানুন পাকা পোক্ত ভাবে তৈরি হ’ল। আগে যেখানে সমাজের মুরুব্বীদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নানা ধরনের ফয়সালা করা সম্ভব হ’ত সেখানে চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্রে কতকগুলো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেয়া আছে। কিন্তু চীফডম বা মুখিয়াতন্ত্রের মূল পরিচয় এখানেই সীমিত নয়।
পূর্বেকার ব্যান্ড সমাজে কিংবা ট্রাইব সমাজে মানুষের মধ্যে মর্যাদার ভেদে কিংবা সম্পদের ভিত্তিতে অবস্থানের কোন পার্থক্য ছিল না। কিন্তু মুখিয়াতন্ত্রে মর্যাদা ভেদে সমাজের সকল মানুষের মধ্যে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ তৈরি হয়েছে। সমাজের সকল মানুষের মর্যাদা সেখানে নির্দিষ্ট।
তাহলে চীফডম বলতে বোঝানো হয়ে থাকে সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে সমাজের প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা নির্দিষ্ট থাকে, মর্যাদা এবং সম্পদের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ থাকে এবং সমগ্র গোষ্ঠীর একজন আনুষ্ঠানিক প্রধান থাকেন যাঁর শাস্তি দেবার কতকগুলি সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা থাকে। সত্যিকার অর্থে সমগ্র গোষ্ঠীর একজন
আনুষ্ঠানিক এবং ক্ষমতাবান নেতা থাকার কারণে এই ব্যবস্থা অন্যান্য রাষ্ট্র বিহীন ব্যবস্থার চেয়ে একেবারে ভিন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পলিনেশিয়া এবং আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম উপকূলের জাতিসমূহের মধ্যে দেখা গেছে প্রধানের সাথে যাঁর আত্মীয়তা যত নিকট তাঁর সামাজিক মর্যাদাও তত বেশি। এর মানে প্রধানের মর্যাদার সাথে অন্যদের মর্যাদা সম্পর্কিত।
প্রধানের ধন-সম্পদ বেশি থাকার নজির পাওয়া গেছে সর্বত্র। চীফ বা প্রধানের একটা দপ্তর থাকে, সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। সেখান থেকেই তিনি শাসন কার্যের বড় সিদ্ধান্তগুলো নেন। অনেক চীফডমে একাধিক পরগণা বা এলাকা ভাগ করা থাকতে পারে, সবগুলোতেই আলাদা প্রধান থাকবেন। চীফডমের প্রধানের অধীনস্ত তাঁরা।

কাউকে শান্তি প্রদানের পরিষ্কার ক্ষমতা ছিল তাঁর। খাদ্য এবং শ্রম বণ্টন করবার সামর্থ্যও তাঁর স্বীকৃত। যেমন ফিজিয়ান চীফডমে চীফের দায়িত্ব ছিল খাদ্য পুনর্বণ্টন এবং শ্রমশক্তি নিয়োগ করার তদারকি করা। একটা বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মুখিয়াতন্ত্রে সামরিক প্রস্তুতি আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে অনেক জোরদার ছিল। সাধারণভাবে পশুপালক সমাজে এবং সাধারণ কৃষিভিত্তিক সমাজে চীফডমের অস্তিত্ব পেয়েছেন নৃবিজ্ঞানীরা ।
এখানে একটা বিষয় আলোচনা করা দরকার। ইউরোপীয় শাসকরা যখন বিভিন্ন অঞ্চলে গেছে তখন চীফড়ম বা মুখিয়াতন্ত্রের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। দুই একটা অঞ্চলে যে ধরনের চীফডম ছিল সেখানে চীফের ক্ষমতা কিংবা নিয়ন্ত্রণ কোনটাই তেমন তীব্র ছিল না। আজকের নৃবিজ্ঞানীদের অনেকেই ব্যাখ্যা করছেন যে ইউরোপের শাসকরা এই ধরনের চীফডম তৈরি করেছে।
আর নৃবিজ্ঞানীরা সেটাই পর্যবেক্ষণ করে এসেছেন। খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে অনেক চীফডমের চীফদের ক্ষমতা কাগজে কলমে সংরক্ষিত ছিল। তার মানে হ’ল আধুনিক রাষ্ট্রের আইন দ্বারা চীফের ক্ষমতা স্বীকৃত। সহজেই বোঝা যায় এই স্বীকৃতি কারা দিচ্ছে।
বিভিন্ন এলাকায় ঔপনিবেশিক শাসন কাজ চালাবার সুবিধায় এবং মানুষজনকে নিয়ন্ত্রণ করবার কাজটা সহজ করবার জন্য ইউরোপের শাসকরা এই পদটা দাঁড় করিয়েছে। সেটা বোঝার জন্য আমরা কাস্টমারি ল’ বা প্রথাগত আইনের কথা বলতে পারি। আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকার সমাজে ঔপনিবেশিক আমলে কাস্টমারি ল’ লিপিবদ্ধ হয়েছে।

তার মানে ইউরোপের শাসনের আগে ঐ আইনগুলো একই রকম ছিল না এবং তার তীব্রতাও ছিল না। যেহেতু লেখ্য আইনের শাসন শক্তি বেশি। চীফডম আসলে আধুনিক পদ্ধতিতে মানুষজনকে নিয়ন্ত্রণ করবার প্রাথমিক পদক্ষেপ ছিল ।
আরও দেখুনঃ
