চাকমাদের সমাজ কাঠামো

আজকের আলোচনার বিষয় চাকমাদের সমাজ কাঠামো – যা চাকমা জনগোষ্ঠী এর অর্ন্তভুক্ত, চাকমা সমাজে ৪৬টি ‘গঝা’ বা গোত্র রয়েছে বলে জানা যায়, যেগুলির প্রতিটি আবার বিভিন্ন গুখি (গুষ্টি) বা উপগোত্রে বিভক্ত। (এই গোত্রগুলির মধ্যে একটির নাম হল ‘লারমা’, যেটি বিশেষভাবে পরিচিতি পেয়েছে জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও তাঁর অনুজ জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার নামের অংশ হিসাবে। উল্লেখ্য, নামের অংশ হিসাবে গোত্র উপাধি ব্যবহারের দৃষ্টান্ত চাকমা সমাজে বিরল)। একসময় চাকমা সমাজে গোত্র সংগঠন বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবে সমকালীন প্রেক্ষিতে এর গুরুত্ব অনেকটা কমে গেছে, অন্ততঃ শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাকমাদের মধ্যে।

চাকমাদের সমাজ কাঠামো

বস্তুতঃ চাকমাসহ সকল পাহাড়ী জনগোষ্ঠী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে শাসন ব্যবস্থার অধীনে চলে আসার পর থেকে গোত্র- সংগঠনের রাজনৈতিক গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছিল, যে প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভবতঃ প্রাক-ব্রিটিশ আমলেই সূচিত হয়েছিল।প্রথাগতভাবে চাকমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা সামাজিক ক্রমোচ্চবিন্যাস ছিল যার শীর্ষ বিন্দুতে অবস্থান করতেন চাকমা রাজা (বা রাণী)।

চাকমাদের সমাজ কাঠামো

 

চাকমাদের সমাজ কাঠামো

 

মোগল বা ব্রিটিশ আমলে রাজ পরিবারের ঠিক পরেই যেসব চাকমা পরিবার সামাজিক-প্রশাসনিক কাঠামোয় সাধারণ প্রজাদের চাইতে উচ্চ অবস্থানে ছিল, তাদের উত্তরসূরীরা এখনো বিভিন্ন সামন্তযুগীয় পদবী – দেওয়ান, তালুকদার, খীসা – ব্যবহার করে থাকেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ব্রিটিশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে যে তিনটি সার্কেলে ভাগ করা হয়েছিল, তার একটি ছিল ‘চাকমা সার্কেল’, যেখানে চাকমা জনগোষ্ঠী কেন্দ্রীভূত ছিল।

চাকমা সার্কেলের চীফ পদটি ছিল চাকমা রাজাদের জন্য সংরক্ষিত। তবে ব্রিটিশ-পূর্ব যুগে চাকমা রাজাদের মর্যাদা যাই হয়ে থাকুক, অন্ততঃ ব্রিটিশ আমল থেকে ‘চাকমা রাজা’ পদটির অর্থ ‘চাকমাদের রাজা’ ছিল না, বরং তা ছিল “চাকমা সার্কেলের চীফ বা রাজা’। এই ব্যবস্থা অনুসারে ‘চাকমা সার্কেলে’ বসবাসরত সকল পাহাড়ী সম্প্রদায়ের উপর কিছু ক্ষেত্রে চাকমা রাজার কর্তৃত্ব স্বীকৃত রয়েছে, পক্ষান্তরে যেসব চাকমা পরিবার অন্যান্য সার্কেলে বসবাস করে, তাদের ক্ষেত্রে অনুরূপ কোন কর্তৃত্ব প্রযোজ্য নয়।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

সার্কেল চীফ বা রাজাদের কার্যাবলীর একটা ছিল নিজ নিজ সার্কেলের অধিবাসীদের কাছ থেকে রাজস্ব -বিশেষতঃ ‘জুম কর’- আদায় করা। সে সাথে প্রথাগত সামাজিক বিচারকার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রেও সার্কেল প্রধানদের কর্তৃত্ব ছিল। প্রতিটা সার্কেল বিভক্ত রয়েছে অনেকগুলি মৌজায়। মৌজা প্রধান বা ‘হেডম্যান’দেরও রাজস্ব আদায় ও সামাজিক বিচারকার্য পরিচালনায় ভূমিকা ছিল।

প্রতিটা পাহাড়ী গ্রাম বা ‘পাড়া’য় রাজা-হেডম্যানদের অনুমোদিত একজন করে গ্রাম প্রধান বা ‘কার্বারী’ রয়েছে। প্রতিটা জুমচাষী পরিবার থেকে একটা নির্দিষ্ট হারে জুম কর আদায় করা হত, যার ভাগ রাজা ও হেডম্যানরা পেতেন (কার্বারীরা এই ভাগ পেতেন না, তবে তাদের বেলায় ‘জুম কর’ মওকুফ ছিল)। ব্রিটিশ আমলের প্রেক্ষিতে রাজা ও হেডম্যানরা সংগৃহীত রাজস্বের যে ভাগ পেতেন, তার যথেষ্ট অর্থমূল্য ছিল, যার ভিত্তিতে চাকমাসহ সকল পাহাড়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা সুস্পষ্ট শ্রেণী বিভাজন গড়ে উঠেছিল।

 

চাকমাদের সমাজ কাঠামো

 

ব্রিটিশ আমলে পাহাড়ী সম্প্রদায়সমূহের জন্য যে “প্রথাগত শাসনব্যবস্থা’ প্রণীত হয়েছিল, তা কাগজে | কলমে এখনো অনেকটা বহাল থাকলেও অনেক দিক থেকেই রাজা-হেডম্যান-কার্বারীদের কর্তৃত্বের | পরিধি বা গুরুত্ব হ্রাস হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষিতে চাকমা তথা পাহাড়ী সমাজে কারো সামাজিক অবস্থান | নিরূপণে পূর্বতন বংশমর্যাদা একমাত্র বা প্রধানতম মাপকাঠি নয়, বরং ব্যক্তির শিক্ষা, পেশা, বিত্ত ইত্যাদি বিষয়ের উপর তা অনেকখানি নির্ভর করে। এদিক থেকে চাকমা সমাজ কাঠামোর বর্তমান গতি- | প্রকৃতি অন্যত্র বিদ্যমান সাধারণ প্রবণতা থেকে ভিন্ন নয়।

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment