Site icon Anthropology Gurukul [ নৃবিজ্ঞান গুরুকুল ] GOLN

গ্রীসীয় পারসিক যুদ্ধ

গ্রীসীয় পারসিক যুদ্ধ

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় গ্রীসীয় পারসিক যুদ্ধ

গ্রীসীয় পারসিক যুদ্ধ

 

 

গ্রীসীয় পারসিক যুদ্ধ

গ্রীকরা যখন বহুসংখ্যক নগররাষ্ট্র নির্মাণের কাজে নিয়োজিত ছিল, পারস্য সম্রাট তখন একের পর এক রাজ্য জয় করে মধ্যপ্রাচ্যে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। ৫৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্য সম্রাট ‘কাইরাস’ লিডিয়া রাজ্য জয় করে নেয়ার ফলে এশিয়া মাইনরের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত গ্রীক উপনিবেশসমূহ অর্থাৎ আয়োনিয়ার গ্রীক নগররাষ্ট্রসমূহ পারস্য সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হয়ে পড়ে।

এর অল্পকাল পরেই পারস্য সম্রাট আয়োনিয়ার গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলোর উপর অধিকার বিস্তার করে। এশিয়া মাইনরের গ্রীক নগরসমূহ অধিকার করার পর পারস্য সম্রাট গ্রীসের মূল ভূখণ্ডের নগরসমূহকে করায়ত্ত করার জন্যে উদ্যোগী হন। কিন্তু এর মধ্যেই ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আয়োনিয়ার সমৃদ্ধতম গ্রীক নগররাষ্ট্র মাইলেটাস পারসিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। সাথে সাথে এশিয়া মাইনরের অন্যান্য গ্রীক নগরসমূহও মাইলেটাস-এর নেতৃত্বে পারসিকদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে।

মাইলেটাস ছিল এ যুগের গ্রীকসভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্রস্বরূপ। মাইলেটাস কৃষ্ণসাগরের উপকূলে বহুসংখ্যক নগররাষ্ট্র স্থাপন করেছিল। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যের মাধ্যমে মাইলেটাস প্রভূত সম্পদ উপার্জন করত। এশিয়ার অভ্যন্তরভাগ এবং মিশরের সাথেও মাইলেটাস-এর বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল। গ্রীক সভ্যতার প্রারম্ভিক যুগে শিল্পপণ্য উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল মাইলেটাস।

এ কারণে প্রথমে গ্রীক বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যচর্চার প্রধান কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় মাইলেটাস। বিশাল পারসিক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে আয়োনিয়ার রাষ্ট্রসমূহ অন্যান্য গ্রীক নগররাষ্ট্রসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করে। এতে সাড়া দিয়ে এথেন্স ২০টি এবং অপর একটি নগররাষ্ট্র ৫টি যুদ্ধজাহাজ পাঠায়। এ সামান্য সাহায্যে আয়োনিয়ার বিশেষ কোনো উপকার হয় না, পারসিকরা তাদের বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করেন।

কিন্তু এ সাহায্যকে উপলক্ষ্য করে পারস্য সম্রাট দারিয়ুস মূল গ্রীক ভূখণ্ডের নগরসমূহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে অগ্রসর হন। ইতিমধ্যে আয়োনিয়ার নগররাষ্ট্রসমূহ পারসিক আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে গ্রীক সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে মাইলেটাস-এর প্রাধান্য খর্ব হয়। আয়োনিয়ার গ্রীক দার্শনিক-বিজ্ঞানীরা দেশত্যাগ করে ইটালির গ্রীক নগরসমূহে বাস স্থাপন করেন।

 

প্রাচিন গ্রীসের জাহাজ (খ্রিঃ পূঃ ষষ্ঠ শতাব্দীর একটির মাটির পাত্রের গায়ে আঁকা ছবি) ডানদিকেরটি মালবাহী জাহাজ, এটি পালে চলত। বা দিকেরটি যুদ্ধজাহাজ, তাতে পালও ছিল দাঁড়ও ছিল।

পরবর্তীকালে গ্রীসের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্ররূপে উদিত হয়েছিল এথেন্স নগরী। গ্রীসের মূল ভূখণ্ড জয় করার লক্ষ্য নিয়ে পারস্য সম্রাট দারিয়ুস প্রথমে ঈজিয়ান সাগরের উত্তর উপকূল এবং এশিয়া মাইনর ও গ্রীসের মধ্যবর্তী গ্রীক নগরসমূহ দখল করে নেন। এরপর ৪৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দারিয়ুসের এক বিশাল বাহিনী জাহাজযোগে ঈজিয়ান সাগর পার হয়ে এ্যাটিকায় অবতরণ করে। এথেন্সের সৈন্যদল তাদের বাধা দিতে অগ্রসর হলে ম্যারাথন নগরীর কাছে দুই দল পরস্পরের মুখোমুখি হয়।

ম্যারাথনের যুদ্ধে এথেন্সের মাত্র দশ হাজার সৈন্য তাদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সৈন্যের পারসিক বাহিনীকে পরাস্ত করে। ম্যারাথনের যুদ্ধে পরাজিত হবার দশ বছর পর পারস্য আবার গ্রীসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন করে। ইতোমধ্যে দারিয়ুসের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে জারেক্সেস পারস্যের সম্রাট হয়েছেন। চার বছর ধরে তিনি গ্রীসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন। হেলেপট্ বা দাবদানেলিস প্রণালীর ওপর দিয়ে একটি সেতু নির্মাণ করা হল। অন্যত্র একটা খাল কেটে যুদ্ধজাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করা হল।

গ্রীকরাও যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। স্পার্টার নেতৃত্বে গ্রীক নগররাষ্ট্রসমূহের একটা প্রতিরক্ষা জোট গঠিত হয়। স্পার্টার মত ছিল স্থলযুদ্ধের পক্ষে। এথেন্সের ধনী ভূস্বামীরাও তাতে সায় দেয়। কিন্তু এথেন্সের উদীয়মান নেতা ও সেনানায়ক থেমিস্টোক্লিস্ বলেন যে, স্থলযুদ্ধে পারসিকদের পরাস্ত করা দুঃসাধ্য। তিনি নৌযুদ্ধের পক্ষে মত দেন এবং এথেনীয় নৌবাহিনী গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন।

৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারসিক বাহিনী থ্রেস্-এর উপকূল দিয়ে অগ্রসর হয়ে উত্তর গ্রীস পর্যন্ত অধিকার করে নেয়। সৈন্যদলের একাংশ জাহাজে করে উপকূল ধরে অগ্রসর হয়। পারসিক স্থলবাহিনী থার্মোপাইলি গিরিপথের মুখে এসে প্রথম গ্রীক সেনাবাহিনীর কাছে বাধা পায়। এ সংকীর্ণ গিরিপথ দিয়েই মধ্য গ্রীসে এবং এথেন্সে যাওয়া চলত। পারসিকদের চেয়ে সংখ্যায় অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও স্বাধীনতাকামী গ্রীকরা বীরত্বের সাথে লড়াই করে পারসিকদের আক্রমণ প্রতিহত করে।

কিন্তু কোনো একজন গ্রীক নাগরিক বিশ্বাসঘাতকতা করে অন্য একটা পথ দিয়ে একদল পারসিক সৈন্যকে গ্রীক সৈন্যদলের পিছনভাগে নিয়ে আসে। এভাবে পরিবেষ্টিত হয়ে গ্রীক সৈন্যরা থার্মোমিপাইলি গিরিপথে বীরত্বের সাথে লড়াই করে প্রাণ বিসর্জন দেয়। গ্রীকরা অবশ্য ইতিমধ্যে নৌযুদ্ধে পারসিকদের একবার পরাস্ত করেছিল। কিন্তু পারসিকরা থার্মোপাইলির যুদ্ধের পর এথেন্স দখল করে তাকে ধ্বংস করে দেয়।

এর ফলে গ্রীকরা পিছিয়ে এসে সালামিস দ্বীপের পাশে সালামিস প্রণালীতে পারসিক নৌবাহিনীকে বাধা দেবার আয়োজন করে।
সালামিসের নৌযুদ্ধের পরিকল্পনা করেছিলেন পূর্বোক্ত থেমিস্টোক্লিস্। এথেনীয় নৌবাহিনী নিয়ে তিনি পারসিক নৌবাহিনীকে বাধা দিতে অগ্রসর হন। অন্যান্য গ্রীক নগরীর নৌবাহিনীও এ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তবে এথেন্সের নৌবাহিনীই ছিল তাদের মধ্যে সর্ববৃহৎ। গ্রীক রণতরীগুলো ছিল হাল্কা ও বেগবান।

পারসিকদের যুদ্ধজাহাজগুলো ছিল মস্ত বড় আর ভারি। খোলা সমুদ্রে যুদ্ধের জন্য এগুলো ছিল খুবই উপযোগী, কিন্তু সালামিস প্রণালীতে এগুলো ছিল একেবারেই বেমানান। পারসিক নৌবহর সালামিস প্রণালীতে প্রবেশ করামাত্র গ্রীক রণতরীগুলো পারসিক যুদ্ধ জাহাজসমূহকে আক্রমণ করে তাদের হাল, দাঁড় ইত্যাদি ভেঙে দেয় এবং অনেকগুলো জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। অবশিষ্ট জাহাজগুলো রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যায়।

সম্রাট জারেক্সেস স্বয়ং বন্দী হবার আশঙ্কায় কিছু সৈন্য মাত্র সাথে নিয়ে দেশে ফিরে যান। সালামিসের যুদ্ধে পারসিকরা এভাবে গ্রীকদের হাতে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। এরপর থেকে পারসিকরা একের গ্রীসে অবস্থানরত পারসিক বাহিনীকে পরাজিত করে। এশিয়া মাইনরের উপকূলের কাছে পর এক গ্রীকদের কাছে যুদ্ধে হারতে থাকে। ৪৭৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সম্মিলিত গ্রীক বাহিনী আরেকটি নৌযুদ্ধেও পারসিক বাহিনী পরাজিত হয়।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

এর পর এশিয়া মাইনরের গ্রীক নগরগুলো পারসিক কবলমুক্ত হয়। গ্রীক থেকে পারসিকরা বিতাড়িত হবার পরও গ্রীসীয়-পারসিক যুদ্ধ আরো প্রায় তিরিশ বছর ধরে চলেছিল। এ সময়ের মধ্যে ঈজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলো থেকে পারসিকরা বিতাড়িত হয়। শেষ পর্যন্ত পারস্যের সম্রাট সন্ধি করতে বাধ্য হন এবং গ্রীক নগরসমূহের স্বাধীনতা স্বীকার করে নেন। ঈজিয়ান সাগরে পারসিক যুদ্ধজাহাজের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

এভাবে স্বাধীনতাপ্রিয় গ্রীক জাতি ক্ষুদ্র সামরিক শক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সাহস ও স্বদেশপ্রেমের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বিশাল ও একদা অপরাজেয় পারসিক রাজশক্তিকে পরাজিত করতে পেরেছিল। এর ফলে গ্রীসের নতুন স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শ এবং জ্ঞানবিজ্ঞান ও মুক্ত সংস্কৃতি প্রাচ্যের স্বৈরাচারী ভাবধারার প্রভাবে কলুষিত না হয়ে স্বাধীনভাবে বিকাশলাভ করতে সক্ষম হয়।

আরও দেখুন :

Exit mobile version