আদিম শিকারী মানুষরা গুহায় বাস করত, এ কথা আমরা আগে বলেছি। কিন্তু একদম শুরু থেকেই যে মানুষ গুহায় বাস করত একথা হয়তো ঠিক নয়। কারণ মানুষের প্রথম উদ্ভব যদি ঘটে থাকে আফ্রিকায়, তবে সেখানে তার বাসগৃহের বিশেষ প্রয়োজন ছিল না। প্রথম যুগে তাই মানুষ সম্ভবত খোলা জায়গাতেই থাকত। তারপর মানুষ যখন পৃথিবীর নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ল তখন উত্তরের শীতপ্রধান অঞ্চলে এবং বিশেষ করে বরফ যুগে শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য মানুষ সম্ভবত গুহাবাসী হয়েছিল।
আদিম সমাজের ঘর বাড়ি
তা ছাড়াও মানুষ যতদিন আগুন আয়ত্ত করেনি ততদিন গুহাবাসী অন্যান্য হিংস্র প্রাণীদের তাড়িয়ে গুহা দখল করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিন্তু গুহা কখনও সব মানুষদের বাসস্থানের সমস্যা দূর করতে পারেনি। সব জায়গাতে তো আর পাহাড় বা গুহা নেই। তা ছাড়াও শিকারী মানুষদের হাতিয়ারের উন্নতি হওয়ার পর যখন তারা বড় বড় প্রাণীদের শিকার করতে শিখেছিল, তখন তাদের পক্ষে এক জায়গায় বসে থাকা সম্ভব ছিল না।
মানুষ তখন বড় বড় বাইসন, বলগা হরিণ আর ঘোড়ার পালকে অনুসরণ করত আর তার থেকে কিছু কিছু প্রাণী শিকার করত। যে শিকারী দল একটা বলগা হরিণের পালকে অনুসরণ করত, তাদের বাধ্য হয়ে বলগা হরিণের সঙ্গে সঙ্গে শত শত মাইল ঘুরে বেড়াতে হত। এ অবস্থায় খোলা জায়গায় কুটির বা তাঁবু বানানোর কৌশল মানুষ ক্রমশ আয়ত্ত করে। অনেক জায়গায় গর্ত খুঁড়েও মানুষ বাস করত।
সাধারণত ডালপালা, হাড় ইত্যাদি দিয়ে তাঁবুর কাঠামো নির্মাণ করা হত এবং তার উপর চামড়ার আচ্ছাদন দেওয়া হত। চেকোশ্লোভাকিয়ায় উচ্চ পুরোপলীয় যুগের (হয়তো ২৫-৩০ হাজার বছর আগেকার) ম্যামথ শিকারীদেরে ঘরের এবং ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব ঘর প্রায় তাঁবুরই মতো। ঘরগুলোর ছাদ তৈরি করা হত কাঠের থামের উপর স্থাপন করে। থামগুলোকে সামান্য গর্ত করে মাটিতে পোঁতা হত এবং তারপর বড় বড় ভারি পাথর দিয়ে ঠেকা দিয়ে তাদের সোজা রাখা হত।
চামড়া দিয়ে ঢেকে এবং ডালপালা, ঘাস, পাতা, মাটির চাপড়া ছাই ইত্যাদি দিয়ে ছাদগুলো তৈরি হত এবং ম্যামথের হাড় ইত্যাদি ভারি জিনিস দিয়ে ছাদ চাপা দেওয়া হত। এখানে কতগুলো কুটির পাওয়া গেছে৷ তাদের চারপাশে গোল করে চুনা পাথর, কাদামাটির দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। এটাই মানুষের নিজের হাতে তৈরি দেওয়ালের প্রাচীনতম নিদর্শন। আজকালকার বিভিন্ন জায়গায় আদিবাসীদের ঘরবাড়ি দেখলেও বোঝা যায় আদিমকালের গৃহনির্মাণ কৌশল কত উন্নতি লাভ করেছিল।
কারণ এসব আদিবাসীদের ঘরবাড়ির মধ্যে আদিমকালের রেশ রয়ে গেছে এবং হাজার হাজার বছর ধরে তার নির্মাণ কৌশল অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। যেমন, আমেরিকা মহাদেশের অনেক শিকারী আদিবাসী (রেড ইণ্ডিয়ান) সুন্দর চামড়ার ঘরে বাস করে। তাদের ছাদগুলো ঢালু এবং ঘরের মাথার কাছে ছাদে ফাঁক রয়েছে ধোঁয়া বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। ঘরের মধ্যে শীত দূর করার জন্য আগুন জ্বালাতে হয় বলে ধোঁয়া বের হওয়ার পথ থাকা খুবই জরুরি।
এস্কিমোরাও চামড়ার স্থায়ী ঘর তৈরি করে বাস করে (অস্থায়ী বাসস্থান হিসেবে বরফের ঘরও তৈরি করে)। ফিলিপাইনের আদিবাসীরা গাছের ডালে ঘর তৈরি করে থাকে। পুরোপলীয় যুগের পর মধ্যোপলীয় যুগের ঘর নির্মাণের কৌশল আরও উন্নত হয়। প্রায় দশ হাজার বছর আগে বরফ যুগের অবসানের পর এ যুগের উদয় হয়েছিল।
হয়েছিল “মধ্যোপলীয় যুগ” বা মধ্য পাথরের যুগ, এ যুগে শিকারের হাতিয়ার ও পুরোপলীয় শিকারী যুগ আর নবোপলীয় কৃষি যুগের মধ্যবর্তী বলে এর নাম দেওয়া · কৌশলের কিছু কিছু উন্নতি হয়েছিল। বরফ যুগের অবসানে এশিয়া ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নতুন করে বন সৃষ্টি হওয়ায় উপরে যেসব ঘরবাড়ির কথা বলা হয়েছে তার কিছু কিছুর উদ্ভব এ যুগেও ঘটে থাকতে পারে। ঘরবাড়ি নির্মাণ ও ঘরসংসারের বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন স্থানের মানুষরা তাদের এলাকার সরঞ্জাম ব্যবহার করত।
যেমন, সাধারণত ঘরে আগুন জ্বালানোর জন্য কাঠকুটো ব্যবহার করা হলেও চেকোশ্লোভাকিয়ার ম্যামথ শিকারীরা কয়লা পোড়াত। এখানে এক কয়লা খনির কয়লা কোনো সময়ে মাটির উপর পর্যন্ত ভেসে উঠেছিল এবং শিকারীরা তার গুণাগুণ আবিষ্কার করতে পেরেছিল। মানব সমাজের বিভিন্ন অংশ এভাবে যে বিভিন্ন সংস্কৃতি আয়ত্ত করেছিল পরবর্তীকালে সেগুলোই বিশ্বমানব সংস্কৃতির ভিত্তি রচনা করেছে।
আরও দেখুন :

