Site icon Anthropology Gurukul [ নৃবিজ্ঞান গুরুকুল ] GOLN

অ-ইউরোপীয় কিংবা সরল সমাজে নারী-পুরুষের প্রভেদ

আজকের আলোচনার বিষয় অ-ইউরোপীয় কিংবা সরল সমাজে নারী-পুরুষের প্রভেদ – যা  লিঙ্গের ভিত্তিতে বিভাজন এর অর্ন্তভুক্ত, আপনারা ইতোমধ্যেই জানেন যে প্রথম কালের নৃবিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন ইউরোপের বাইরের সমাজে। সাধারণভাবে যে সকল সমাজ শিল্পোন্নত কিংবা প্রযুক্তি নির্ভর ছিল না, নৃবিজ্ঞানের আগ্রহ ছিল সেই সব সমাজ নিয়ে। আফ্রিকা, এশিয়া কিংবা আমেরিকার আদিবাসীদের এই সব সমাজকে প্রথম পর্যায়ের নৃবিজ্ঞানে আদিম সমাজ বলা হ’ত। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৃবিজ্ঞানীরা এই সব সমাজের নাম দেন ‘সরল’ সমাজ।

প্রথম দিকের নৃবিজ্ঞানে সামাজিক বিভাজন দেখতে গিয়ে নৃবিজ্ঞানীরা মূলত কাজ কর্মের ভাগাভাগির পদ্ধতির উপর মনোযোগ দিয়েছেন। কোন সমাজে কাজ কর্মের ভাগাভাগির প্রক্রিয়াকে সামাজিক বিজ্ঞানে শ্রম বিভাজন বলা হয়। অর্থাৎ সমাজের বিভিন্ন মানুষ কি কি দায়িত্ব পালন করবে তার একটা ব্যবস্থা থাকে। এভাবেই সমাজে উৎপাদন হয়। এখানে নারী-পুরুষের বিভাজনের কথা হচ্ছে। এখানে মনে রাখা দরকার নৃবিজ্ঞানীরা যে সব সমাজে গবেষণা চালিয়েছেন সেই সময়ে তার অনেকগুলোতেই আজকের যুগের মত বৈষম্য ছিল না । তা সে নারী পুরুষের মধ্যেই হোক, আর সমাজের মানুষে মানুষে হোক। তাছাড়া আজকের যুগে সম্পদের রকম অনেক বেড়ে গেছে।

অ-ইউরোপীয় কিংবা সরল সমাজে নারী-পুরুষের প্রভেদ

 

 

ফলে সম্পদের ভিত্তিতে ভেদাভেদ তৈরি হবার পরিস্থিতি এখন অনেক তীব্র। সমাজে এক সময় মাতৃ-অধিকার ছিল বলে সামাজিক বিজ্ঞানের অনেক চিন্তাবিদ মনে করেন। মাতৃ- অধিকারের ধারণা দিয়েছেন বাকোফেন, এঙ্গেলস, মর্গান প্রমুখ। এই ধারণার সারাংশ হচ্ছে: এক সময়ে পুরুষের হাতে ক্ষমতা ছিল না। সমাজ এবং পরিচালনার যাবতীয় কর্তৃত্ব ছিল নারীর হাতে। কেবল তাই নয়, সন্তানের পরিচয় নির্ধারিত হ’ত মায়ের দ্বারা। মায়ের বংশই স্বীকৃত হ’ত। সেই সমাজের নাম দেয়া হয়েছে আদি সাম্যবাদী সমাজ। এই ধারণার পক্ষে নানান যুক্তিও তাঁরা হাজির করেছেন।

সামাজিক বিজ্ঞানে এই ধারণা যুগান্তকারী হিসেবে দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে নারীর লড়াইয়ে যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁদের জন্য এটা একটা বিরাট উদ্যম হিসেবে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী কালে এই চিন্তার যাবতীয় দুর্বলতা ধরা পড়ে। প্রথমত, কোন এক কালে এই ব্যবস্থা ছিল – এটা একটা অনুমান করা ব্যাখ্যা। যখন – থেকে নৃবিজ্ঞানের গবেষণা চলছে তখন এর তেমন কোন উদাহরণ পাওয়া যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে সমাজে মায়ের পরিচয় ধরেই আত্মীয়তা বা আবাস-বাড়ি গড়ে উঠছে। কিন্তু মাতৃ-অধিকারের ধারণা থেকে তা খুবই ভিন্ন।

বরং বিভিন্ন সমাজে নারীর প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব, কিংবা নিপীড়নের নানা রকম ধরন খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। এ কথা ঠিক, সমাজভেদে তা ভিন্ন, এবং অধিকাংশ অতীতের সমাজে এর নজির খুবই কম। দ্বিতীয়ত, মাতৃ-অধিকার যদি থেকেই থাকে তাহলে তা কেন সহসা বদলে গেল তার কোন ভাল ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তৃতীয়ত, অনেক নারী আন্দোলনকারী মনে করেন: এ রকম কাল্পনিক একটা তত্ত্ব ধরে নিয়ে এগোলে বর্তমান কালের পুরুষের ক্ষমতা এবং পুরুষকেন্দ্রিক ব্যবস্থা অনুমোদন পায়।

মানে ‘এক সময়ে যেহেতু নারীর ক্ষমতা ছিল – এখন তাহলে পুরুষের ক্ষমতার দোষ কি!’ তাঁদের ব্যাখ্যা হচ্ছে: যদি নারীকেন্দ্রিক সমাজ কখনো থেকেই থাকে – তার গড়ন আজকের – মত আক্রমণাত্মক ছিল না। সেটা সমাজ ইতিহাস বিশে ষণ করলে বোঝা যায়। নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণাতে লক্ষ্য করা গেছে সকল সমাজেই নারী-পুরুষের কাজ কর্মের মধ্যে ভিন্নতা আছে। এর মানে হ’ল খাদ্য উৎপাদনের কাজে পুরুষের কিছু স্বতন্ত্র দায়িত্ব আছে আর নারীর কিছু স্বতন্ত্র দায়িত্ব আছে। উৎপাদনের কাজে নারী ও পুরুষের দায়িত্বের বিভাজনকে লিঙ্গীয় শ্রম বিভাজন বলা হয়।

যে সব সমাজকে শিকারী-সংগ্রহকারী সমাজ বলা হয়ে থাকে সেখানে প্রায়শই পুরুষরা শিকারী এবং নারীরা সংগ্রহকারী। এর মানে হচ্ছে শিকারের কাজ কিছু পুরুষরা করে থাকেন এবং নারীরা এবং অন্যরা – যেমন বয়স্করা, বাচ্চারা ফলমূল সংগ্রহ করে থাকেন। কিন্তু এই ধারণার বিপরীতে নানান উদাহরণও আছে। যেমন: হাডজা এবং ভারতের পলিয়ানদের মধ্যে পুরুষরা নিজেদের জন্য বৃক্ষজাত খাদ্য সংগ্রহ করে থাকেন। আর নারীরা নিজেদের এবং বাচ্চাদের জন্য একই খাদ্য সংগ্রহ করে থাকেন। আবার যেখানে শিকার একটা যৌথকাজ হিসেবে বিবেচিত সেখানে দেখা যায় ভিন্ন ব্যাপার।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

যেমন: স্মৃতিদের  মধ্যে নারী ও পুরুষরা একত্রে জন্তু জানোয়ারকে তাড়া করে শিকারের এলাকাতে নিয়ে যায়। অবশ্য বৃহৎ জন্তুর বেলায় সেটা শিকারের দায়িত্ব পুরুষরাই পালন করে থাকে। উদ্যান-কৃষির সমাজেও নারী পুরুষের শ্রম বিভাজনের নজির পাওয়া যায়। কোন কোন গবেষণাতে দেখা গেছে, পুরুষরা জমি সাফ করার কাজটা সাধারণত করে থাকেন। আর চাষবাসের কাজটা নারী পুরুষ একত্রে করেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় নারীরাই প্রধান খাদ্য উৎপাদনের দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। যেমন: নিউ গিনিতে জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী মিষ্টি আলু উৎপাদন করে থাকেন নারীরা।

পুরুষরা সেখানে উৎপাদন করেন চিনি, কলা যেগুলো অন্যত্র বিনিময় করা হয়। কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থায় সাধারণভাবে উৎপাদনের প্রাথমিক কাজগুলো পুরুষরা করে থাকেন। আর উৎপাদন প্রক্রিয়াজাত করণ সমেত রান্না-বান্না ইত্যাদি কাজ নারীরা করে থাকেন। তবে এই চিত্রের সাধারণ কোন প্রমাণ নেই ।

বাংলাদেশের কৃষিতেও উৎপাদন কাজে নারীরা ব্যাপকভাবে অংশ নিয়ে থাকেন। পাশাপাশি রান্না-বান্নার পুরোটাই এবং ফসল প্রক্রিয়াজাত করণের পুরোটাই তাঁদের উপর গিয়ে বর্তায়। এভাবে নানা উদাহরণ দিয়ে দেখানো সম্ভব যে বিভিন্ন সমাজে নারী ও পুরুষের কাজ আলাদা আলাদা থাকে। কিন্তু এ দিয়ে কোন কিছু বুঝতে যাওয়া ঠিক হবে না। কারণ কোন একটা সমাজে যেটা নারীদের কাজ অন্য সমাজে সেটাই হয়তো পুরুষের কাজ। যেমন: সূতোতে বোনার কাজটা আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের জাতিসমূহের মধ্যে নারীরা করেন, কিন্তু আফ্রিকাতে পুরুষরাই করে থাকেন। আবার ভারত, মধ্য আফ্রিকাতে মাটির পাত্র বানাবার কাজটা পুরুষের এবং পশ্চিম আফ্রিকা কিংবা আমেরিকান ভূখন্ডের আদিবাসীদের মধ্যে এটা নারীদের কাজ।

অধিকাংশ অ-ইউরোপীয় সমাজ বা প্রথম যুগের নৃবিজ্ঞানীদের ভাষায় সরল সমাজে বাচ্চা দেখাশোনার কাজ মায়েরা যেমন করে থাকেন, তেমনি তা অন্যদের অবসরের কাজও বটে। বয়স্ক লোকজন, একটু বেশি বয়সের বাচ্চারা কিংবা জোয়ান পুরুষরা যাঁরা উৎপাদন কাজে যাচ্ছেন না তাঁরা যে কেউই এই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। বরং অধিকাংশ নৃবিজ্ঞানীই এই যুক্তি দেখিয়েছেন যে এই সব সমাজে আর্থিক এবং ক্ষমতার দিক থেকে কোন উঁচু-নিচু ভেদ ছিল না। ফলে কাজের ভিন্নতা দিয়ে সমাজে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ বুঝতে যাওয়া ঠিক হবে না। ভেদাভেদ বলতে এখানে সুযোগ-সুবিধার বঞ্চনা বোঝানো হচ্ছে।

কোন কোন তাত্ত্বিক যুক্তি দেখিয়ে থাকেন যে নারীরা শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় সমাজে কাজ-কর্মের এই হেরফের, এবং এ কারণেই নারী পুরুষের তুলনায় বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকে। কিন্তু এই যুক্তি খুবই একপেশে এবং দুর্বল। প্রথমত, শারিরীকভাবে প্রাণীকূলের মধ্যে মানুষের চেয়ে বলশালী অনেক প্রাণী আছে। আর তাছাড়া বহু সমাজে নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকেই এমন প্রমাণ মিলেছে যে সমাজে নারীরা মোট কাজের বেশির ভাগ করে থাকেন। আরেক ধরনের যুক্তি হচ্ছে নারীরা ঐতিহাসিকভাবে বাচ্চা লালন-পালনের সাথে যুক্ত বলে এবং বাচ্চা হওয়ার সময়ে লম্বা বিরতি দিতে হয় বলে নারীরা ‘কম’ গুরুত্বের কাজগুলো করে থাকেন এবং সে কারণে সমাজে তাঁদের বঞ্চনা।

এই যুক্তিরও বড় ধরনের দুর্বলতা আছে। প্রথমত, নারীরা যে কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকেন তা নয়। বরং, আগেই আলোচিত হয়েছে, উৎপাদনের সিংহভাগ কাজই তাঁরা হরে থাকেন অধিকাংশ সমাজে। আর ঘর-গেরস্থালির কাজ প্রায় পুরোটাই, বিশেষ করে বর্তমান সমাজে।

 

অ-ইউরোপীয় কিংবা সরল সমাজে নারী-পুরুষের প্রভেদ

 

বরং দেখা যায়, নারীর কাজকে অল্প গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, বহু সমাজেই বাচ্চা পেটে নিয়ে নারীরা কাজ করে থাকেন। আর বর্তমান কালে বাচ্চা হওয়া কমানোর প্রক্রিয়াতেও নারীর নিপীড়ন চলছে। পরিবার পরিকল্পনার যাবতীয় পদ্ধতি, বিশেষভাবে যেগুলো রাসায়নিক, চরম একপেশে যেমন ধরুন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি যার থাকতে পারে বিভিন্ন রকমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এ সমস্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে সহজেই বোঝা যায় সমাজে নারী পুরুষের ভেদাভেদ বা বৈষম্যের উৎস অন্য কোথাও। সমকালীন নগর সমাজের বাস্তবতার দিকে তাকালে সেটা আরও সহজে বোঝা যায়।

 

আরও দেখুনঃ

Exit mobile version